খামেনি হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর যা জানা যাচ্ছে

Date:

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও আলোচনা নির্ধারিত ছিল। সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন, কোনো হত্যাচেষ্টা হলেও রাতে হতে পারে। তাই গত শনিবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি তেহরানে তার নিজস্ব কমপ্লেক্সেই ছিলেন। সেটিই ছিল তার জীবনের শেষ সকাল।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলাকালে সেই কমপ্লেক্সে একটি বিমান হামলা চালানো হয়। হামলায় খামেনি, তার স্ত্রী এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক সপ্তাহে ইরানে হাজার হাজার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর মধ্যে ধীরে ধীরে কিছু তথ্য সামনে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও মোসাদ অভিযানটি পরিকল্পনা করেছিল। এই ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কতটা গভীরভাবে অনুপ্রবেশ করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল ইসরায়েলের একটি হামলা। তবে এটি সম্ভব হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ গোয়েন্দা নজরদারিতে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হামলার দিন ভোরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) খামেনির অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করেছিল।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের প্রায় সব সড়ক নজরদারি ক্যামেরা কয়েক বছর আগেই ইসরায়েল হ্যাক করেছিল। সেগুলোর এনক্রিপ্টেড ভিডিও ফিড ইসরায়েলের সার্ভারে পাঠানো হতো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তেহরানের কেন্দ্রে পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত সর্বোচ্চ নেতার কমপ্লেক্সের দিকে একটি ক্যামেরার বিশেষ দৃষ্টিকোণ ছিল। এর মাধ্যমে নিরাপত্তারক্ষীদের পরিচয়, তাদের দৈনন্দিন রুটিন এবং চলাচল শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, আমরা তেহরানকে জেরুজালেমের মতোই ভালোভাবে চিনি।’

খামেনির সঙ্গে ইরানের কতজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।

ইরানি গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, সেনাবাহিনীর প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি, বিপ্লবী গার্ডসের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পুলিশ গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধানসহ আরও কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

এএফপি জানায়, ইসরায়েলি গণমাধ্যমের কিছু অনিশ্চিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে খামেনির মরদেহের একটি ছবি পাঠানো হয়েছিল।

কলামিস্ট বেন ক্যাসপিট লিখেছেন, ‘তার হত্যার বিস্তারিত প্রকাশ পেলে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে।’

ইসরায়েলি পত্রিকা মারিভে ক্যাসপিট লিখেছেন, ‘ইরান পুরোপুরি অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছে। এই প্রাথমিক হামলাটি আগামী বহু বছর ধরে বিশ্বের সামরিক কলেজগুলোতে পড়ানো হবে।’

সামরিক বিশ্লেষক ইয়োসি ইয়েহোশুয়া দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনোথে লিখেছেন, খামেনির হত্যাকাণ্ড ‘মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে এবং ইসরায়েলকে এমন এক সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যা তারা আগে কখনো পায়নি।’

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রাষ্ট্রনেতাকে হত্যার একটি বিপজ্জনক নজিরও তৈরি করতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের প্রাণঘাতী হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবে এরপর থেকে তাদের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আবার নিজেদের সুনাম বাড়িয়েছে।

আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈরুতে হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ এবং হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়েহ, যিনি তেহরানে নিহত হন।

ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সদস্যদের ওপর এক বিস্ময়কর হামলাও চালায়। সেখানে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর ব্যবহৃত কক্ষে ছোট বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

এএফপি জানায়, এ ধরনের অভিযানে ইসরায়েলের সক্ষমতা স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। খামেনিকে হত্যা করে তারা ‘সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এক ধরনের শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে।’

মোসাদ নিয়ে একটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক ইসরায়েলি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যান বলেছেন, খামেনি গোপনে বসবাস করতেন না।

তিনি সামাজিক মাধ্যমে রসিকতা করে লিখেছেন, ‘মনে হয় যেন তার দরজায় একটি সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল—এখানে সুখী খামেনি পরিবার বাস করে।’

তবে অন্যরা মনে করেন, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি হয়তো মৃত্যুকে শহীদত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। অথবা তিনি বিশ্বাস করতেন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে হত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন তাকে সুরক্ষা দেবে।

একাধিক সংঘাত নিয়ে কাজ করা ফরাসি সেনাবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে এএফপিকে বলেছেন, খামেনির মৃত্যুর পূর্ণ প্রভাব এখনো বোঝা বাকি।

ওই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘গোপন অভিযানের বিস্তারিত স্বাভাবিকভাবেই জানা খুব কঠিন এবং এটি তথ্যযুদ্ধের একটি বড় ক্ষেত্র।’

তিনি বলেন, ‘এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে যে এটি ছিল একটি পরিষ্কার, নিখুঁত ও ত্রুটিহীন অভিযান। আর এটি এক আঘাতেই একটি শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু অন্য পক্ষ তাসের খেলা খেলছে না। এটি লাস ভেগাস নয়। তারা দাবা খেলছে—এবং একটি বড় ঘুঁটি হারালেই খেলা শেষ হয়ে যায় না।’

Popular

More like this
Related

ইবির শিক্ষক হত্যায় অভিযুক্ত ২ শিক্ষক ও ১ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী...

যুদ্ধ বন্ধের বার্তা নিয়ে ফিরে এলেন ‘সুবোধ’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পুরোনো বিমানবন্দর এলাকার একটি দেয়ালে আবারও দেখা...

সানিক্স কাপ খেলতে জাপান যাচ্ছে বিকেএসপি ফুটবল দল

সানিক্স কাপ আন্তর্জাতিক যুব ফুটবল টুর্নামেন্ট অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে...

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের উপকার করেছে: ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের...