কেমন আছে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটায় গড়ে তোলা স্মৃতিকেন্দ্রটি?

Date:

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রাম। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর এই নিভৃত পল্লীতেই জন্ম নিয়েছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। যে মহীয়সী নারী অন্ধকার যুগে নারী শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন, আজ তারই জন্মভিটায় নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটি যেন নিজেই অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করছে। প্রতিষ্ঠার আড়াই দশকেও এটি হয়ে উঠতে পারেনি নারী শিক্ষা বা গবেষণার সেই কাঙ্ক্ষিত প্রাণকেন্দ্র।

রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের আঙিনায় পা রাখলেই চোখে পড়ে অযত্নের ছাপ। একসময়ের ঝকঝকে ভবনগুলোর দেয়াল থেকে প্লাস্টার খসে পড়ছে। ইটে জমেছে শ্যাওলা। ভবনের বেশিরভাগ কক্ষই তালাবদ্ধ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোকেয়ার জন্মকক্ষ বা আঁতুরঘরটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ, দিঘী ও বেহাত হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে নেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি।

দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা রোকেয়ার জন্মভিটায় এসে ফিরে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুবা খন্দকারের ভাষায়, ‘রোকেয়ার সংগ্রামের কারণেই আজ আমরা মেয়েরা পড়তে পারছি, অথচ তার জন্মভিটার এই অবহেলা সত্যিই কষ্ট দেয়।’

১৯৯৭ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর ২০০১ সালে ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়েছিল এই স্মৃতিকেন্দ্র। লক্ষ্য ছিল—গবেষণা কেন্দ্র, লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক চর্চা। কিন্তু শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ছিল চরম উদাসীনতা।

২০১৯ সালে সীমিত আকারে সংগীত ও চিত্রাঙ্কন কোর্স চালু হলেও করোনা ও অব্যবস্থাপনায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে আবার নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি থেমে যায়। রোকেয়ার সাহিত্য—সুলতানার স্বপ্ন, মতিচূর বা অবরোধবাসিনী নিয়ে গভীর কোনো গবেষণা, অনুবাদ, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এখানে এখনো অনুপস্থিত।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, কলকাতা থেকে বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ পায়রাবন্দে ফিরিয়ে আনা হোক। বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিষয়টি আজও কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। রোকেয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সুলতানা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা অন্তত তার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে চাই।’

তবে দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর সম্প্রতি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্মৃতিকেন্দ্রটি এখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাংলা একাডেমির সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতোমধ্যে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত ও নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ পুনরায় শুরু করা হয়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. শওকাত আলী জানান, এই চুক্তির ফলে গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়বে, যা কেন্দ্রটিকে প্রাণবন্ত করে তুলবে।

বাংলা একাডেমির সহপরিচালক ও স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবিদ করিম মুন্না জানান, ইতোমধ্যে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত প্রশিক্ষণ ও নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি রোকেয়ার জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিভিন্ন বই দিয়ে লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করা হয়েছে। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় স্মৃতিকেন্দ্রের ব্যবহার বাড়বে। উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি খুব কম। তবে সম্প্রতি স্মৃতিকেন্দ্রটিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করায় আমরা নতুন করে আশাবাদী।

 

Popular

More like this
Related

টিভিতে প্রথম গান গাইলেন বুবলি

এবারের ঈদে ভিন্ন কিছু নিয়ে আসছে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান...

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে ভাতা দিতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেব: মির্জা ফখরুল

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ও বিএনপি...

প্রধানমন্ত্রীর দুই ইফতার মাহফিল বাতিল

বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বনির্ধারিত দুটি ইফতার...

ইসরায়েলের হামলায় তেহরানে ‘আগুনের নদী’

টানা নয় দিন ধরে ইরানের সামরিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে টার্গেট...