‘কেন আমার জীবন এভাবে নষ্ট করে দিলো?’

Date:

গত বছর ঈদুল আজহার আগে সৌদি আরবে যান রিমা (ছদ্মনাম)। ভেবেছিলেন, বিদেশি একটি কোম্পানিতে মাসিক এক হাজার রিয়াল বেতনে চাকরি পেয়েছেন, যেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। মনে হচ্ছিল, নতুন দেশে জীবনটা নতুন করে শুরু হবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভাবনার মতো সত্য হয়নি। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরই রিমা বুঝতে পারেন, তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এর সঙ্গে তাকে কারাগারেও যেতে হয়।

৩২ বছর বয়সী রিমা এখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় এই নারী এখন উত্তরার আশকোনা হাজি ক্যাম্পের ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের লার্নিং সেন্টারে থাকছেন।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে রিমা বলেন, ‘আমি টাকা উপার্জনের জন্য বিদেশ যাইনি। আমার কোনো ঋণ ছিল না। আমি শুধু একটি সম্মানজনক চাকরি চেয়েছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘চাকরি না দিতে পারলে তারা আমাকে দেশে ফেরত পাঠাতে পারত। কেন আমার জীবন এভাবে নষ্ট করে দিলো?’

রিমা জানান, ঢাকার এক স্থানীয় দালাল তার ভিসার ব্যবস্থা করে দেন। ওই ব্যক্তি তাকে কোম্পানিতে চাকরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।

তিনি জানেন না, তার সৌদি আরবে যেতে কত টাকা খরচ হয়েছে। কারণ পুরো খরচ বহন করেন সেই বাংলাদেশি নারী, যার জন্য তিনি গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

রিমা আরও দুই নারীর সঙ্গে সেদেশে যান। পৌঁছানোর পর তাকে একটি অফিসে তিন দিন রাখা হয়। সেখানে যথাযথ খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। এরপর তাকে একটি পরিবারের কাছে পাঠানো হয়।

রিমা বলেন, ‘তারা ফ্রিজে তালা দিয়ে রাখত। এমনকি চালের পাত্রেও তালা দেওয়া ছিল। সারাদিনের জন্য আমাকে শুধু একটি রুটি আর একটি ডিম দেওয়া হতো। আমি ২৪ ঘণ্টা কাজ করতাম।’

তিনি অফিসে ফিরে যাওয়ার জন্য বললে নিয়োগকর্তা জানান, তারা তাকে ‘কিনেছে’ ১০ হাজার রিয়ালে। তাকে যেতে দেওয়া হবে না।

কয়েক মাস নির্যাতনের পর রিমা প্রথমে মদিনায় এবং পরে মক্কায় পালিয়ে যান। তিনি আশা করছিলেন, হয়তো পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

তিনি সাময়িকভাবে আটক হলেও পরে মুক্তি পান। এরপর তিনি এক বাংলাদেশি নারীর কাছে গিয়ে প্রতারিত হন। ওই নারী তাকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো টাকা ছাড়াই যৌনকর্মে বাধ্য করেন।

তিনি বলেন, ‘যৌনকর্ম চালিয়ে যেতে আমি অস্বীকৃতি জানাই এবং আমি আমার টাকা চাই। তারা আমাকে একটি কক্ষে আটকে নির্যাতন করে এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিয়োগকর্তার ঘনিষ্ঠ এক ড্রাইভার তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার আগে ধর্ষণ করেছিল।

এরপর রিমা তার নিয়োগকর্তার দায়ের করা চুরির অভিযোগে পাঁচ মাসের জন্য কারাগারে ছিলেন।

হাতের দাগ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘কারাগারে তারা আমাকে মারধর করেছে এবং বৈদ্যুতিক শক দিয়েছে। আমি বারবার বলেছি, আমি কিছুই চুরি করিনি।’ আটক অবস্থায় মেডিকেল পরীক্ষায় জানা যায়, তিনি অন্তঃসত্ত্বা।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মা নেই। এতিমখানায় বড় হয়েছি। এখন আমি কোথায় যাব? বেঁচে দেশে ফিরেছি ঠিকই। কিন্তু এই সন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচব? আমাকে কে গ্রহণ করবে?’

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে গ্রহণ করার মতো কোনো পরিবার না থাকায় তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সহায়তা চান এবং পরে তাকে ব্র্যাকে পাঠানো হয়।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার অন্তত ছয়জন নারী সন্তানসম্ভবা হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন।

পৃথক তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে বিদেশে যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত ১৫৭ জন প্রবাসী শ্রমিক বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ ভয় ও সামাজিক অপবাদের কারণে অনেকেই নির্যাতনের ঘটনা জানান না।’

রিমার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে শরিফুল সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, ‘ওই নারী আশা নিয়ে গিয়েছিলেন। একটু ভালোভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়োগকর্তার বাড়িতেই তাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়েছে।’

শরিফুল বলেন, ট্রাভেল পাস দেওয়ার আগে দূতাবাসের আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ট্রাভেল পাস দেওয়ার আগে দূতাবাস তার কথা শুনেছিল। তাহলে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তদন্তের অনুরোধ করা হলো না কেন? নিয়োগকর্তাকে তলব করা হয়নি কেন? আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা হলো না কেন?’

ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছিল কিনা এবং কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে— এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

শরিফুল বলেন, ‘তারা অসহায় বলেই যান। সেখানে গিয়ে তারা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। অথচ দূতাবাস পর্যায়ে রাষ্ট্রকে তাদের জন্য কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।’

নির্যাতনের শিকার নারীদের নীরবে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অপরাধের শাস্তি না হলে নির্যাতন চলতেই থাকে। আরও নারী ভুক্তভোগী হন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বিষয়টিকে সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করি… কিন্তু এটি কেবল সংখ্যা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। প্রতিটি ঘটনা একটি জীবনের গল্প।’

নিয়োগকারী সংস্থা ও দূতাবাস কর্মকর্তাদের ভূমিকাসহ পুরো ঘটনাটি ভালোভাবে তদন্ত করার পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হলে তা পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি ক্ষত। ন্যায়বিচার দৃশ্যমান হতে হবে। জবাবদিহি হতে হবে বাস্তব।’

Popular

More like this
Related

একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনের...

ওমানকে উড়িয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার হতাশাজনক বিশ্বকাপের সমাপ্তি

অধিনায়ক মিচেল মার্শের ৩৩ বলে অপরাজিত ৬৪ রানের বিধ্বংসী...

রংপুরের মানুষ ভুলে যেতে বসেছে ‘অমপুরিয়া’ ভাষা

তিস্তাপাড়ের বারোঘরিয়া গ্রাম। দুই প্রবীণ কৃষক নিজেদের মধ্যে কথা...

পরমাণু আলোচনা: কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টা খসড়া প্রস্তাব দিতে পারে ইরান

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলতি সপ্তাহের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ...