কালিম পাখিটি এখন যেন পরিবারের সদস্য, নাম ধরে ডাকলেই ছুটে আসে কাছে

Date:

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে এক অনন্য মৈত্রীর নজির গড়েছে এক কালিম পাখি। পাখিটি এখন স্থানীয় একটি পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবারের আদরের এই পাখির নাম দেওয়া হয়েছে ‘লালু’। নাম ধরে ডাকলেই সে কাছে ছুটে আসে।

গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে পাখিটি উপজেলার ভণ্ডগ্রাম গ্রামের শামস উদ্দিনের বাড়ির টিনের চালের ওপর বসবাস করছে। বাড়ির আঙিনায় প্রায় সময়ই পাখিটিকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কখনো ঘরের চাল থেকে নেমে ছড়িয়ে থাকা খাদ্যদানা খায়, আবার কিছুক্ষণ পর সেখানে ফিরে যায়।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা জানান, পাখিটি মাঝেমধ্যেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে, ভাত খেতে দিলে তা খায়, তারপর উড়ে গিয়ে চালের ওপর শিমগাছের লতার আড়ালে থাকা বাসায় ফিরে যায়।

তারা বলেন, এক ঝড়ের রাতে শামস উদ্দিনের প্রতিবেশী ফারুক আহমেদের বাড়ির উঠানে পাখিটিকে পাওয়া যায়। তখন আহত থাকায় উড়তে পারছিল না। ফারুক ও তার পরিবার পাখিটির সেবা-যত্ন করেন। পরে সুস্থ হয়ে উঠলেও পাখিটি এলাকা ছেড়ে যায়নি। প্রায় চার মাস পর এটি প্রতিবেশী শামস উদ্দিনের বাড়িতে উড়ে আসে এবং তখন থেকে সেখানেই রয়েছে।

প্রতিবেশী ফারুক বলেন, একবার পাখিটা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানেই জানতে পারি পাখিটির নাম কালিম। বর্তমানে পাখিটি শামস উদ্দিনের বাড়িতে বাসা করলেও প্রতিদিন খাবারের জন্য তার বাড়িতেও আসা যাওয়া করে ।

জলাভূমির পাখি কালিম। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। পালক চকচকে নীলচে-বেগুনি, পা লালচে এবং লম্বা আঙুলযুক্ত। কপালে লাল ঢালের মতো অংশ রয়েছে এবং লেজের নিচের অংশ সাদা।

সাহসী ও কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বভাবের জন্য পরিচিত এই পাখিকে প্রায়ই নিজের খাবার বা নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিরোধ করতে দেখা যায়। এর খাদ্যতালিকায় থাকে জলজ উদ্ভিদ, কচি ডগা, পদ্মের বিভিন্ন অংশ, ব্যাঙাচি, পোকামাকড় ও ছোট মাছ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কয়েক দশক আগেও দেশের জলাভূমিগুলোতে এ ধরনের পাখি বেশি দেখা যেত। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস ও শিকারের কারণে এখন সংখ্যায় কমে গেছে।  

অতি সম্প্রতি ওই গ্রামে শামস উদ্দীনের বাড়িতে গেলে এই প্রতিবেদক পাখিটিকে ঘরের চালে শিমের লতার নিচে বসে থাকতে দেখেন। কিছুক্ষণ বাড়ির চারপাশে উড়ে বেরিয়ে আবার দ্রুত নীড়ে ফিরে আসে। বাসিন্দারা জানান, লালু যদি আশপাশে অপরিচিত কাউকে দেখতে পায়, তখন প্রায়ই তাদের দিকে তেড়ে যায়—সম্ভবত তাদের হুমকি মনে করে।

সম্প্রতি পাখিটি নয়টি ডিম দিয়েছে এবং এখন বেশিরভাগ সময় সেগুলোতে তা দিতেই ব্যস্ত থাকে। তারা বলেন, ‘খাবারের সময় ছাড়া এটি খুব একটা নিচে নামে না। কেউ যদি ডিমের কাছে যায়, তখন আক্রমণ করতে চায়।’

শামস উদ্দিনের স্ত্রী পারুল আক্তার ‘লালু’ বলে ডাকলে পাখিটি দ্রুত কাছে এসে তার হাতের তালুতে রাখা ভাত খেয়ে আবার বাসায় ফিরে যায়। পারুল বলেন, ‘শুনেছি কালিম পাখি সাধারণত আক্রমণাত্মক হয়। কিন্তু আদর পেলে এটি আমাদের কোলে বসে থাকে, বাড়ির ভেতরেও ঘুরে বেড়ায়।’

তিনি জানান, হাঁস-মুরগির মতোই খাবার দেওয়া হয় পাখিটিকে। পাখিটি স্ত্রী। এর জন্য একটি পুরুষ সঙ্গী জোগাড় করার চেষ্টা করছেন তারা।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যার সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর বলেন, এটি দেশের স্থানীয় জলাভূমির পাখি। স্বভাবে সাহসী ও কখনো আক্রমণাত্মক হলেও খাবার ও নিরাপত্তা পেলে বুনো প্রাণীও সহজেই পোষ মানতে পারে। প্রাণীরা সাধারণত এমন জায়গার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যেখানে তারা নিরাপদ বোধ করে এবং পর্যাপ্ত খাবার পায়।

রানীশংকৈল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রূপম চন্দ্র মহন্ত বলেন, নিরাপদ মনে করায় পাখিটি সম্ভবত শামস উদ্দিনের বাড়িতে বাসা বেঁধেছে। স্ত্রী কালিম কখনো কখনো নিষিক্ত না হলেও ডিম পাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রজাতিটি হুমকির মুখে না থাকলেও আবাসস্থল নষ্ট করে ফেলা ও শিকারের কারণে বাংলাদেশে এদের সংখ্যা কমছে।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী পাখিটি সংরক্ষিত। তাই কেউ এ ধরনের পাখি পুষতে চাইলে বন বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

Popular

More like this
Related

ইরানের নতুন লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ...

ফরিদপুর ও কুড়িগ্রামে দুর্ঘটনায় নিহত ২

ফরিদপুর ও কুড়িগ্রামে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন...

ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৮টায়

রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জাতীয় ঈদগাহে আসন্ন ঈদুল ফিতরের...

তেহরানের আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়ার মেঘ, যুদ্ধাপরাধের শামিল বলছে ইরান

ইরানের জ্বালানি ডিপো ও তেল শোধনাগারে ইসরায়েল হামলা চালানোর...