ইরানের এক ‘শীর্ষ ব্যক্তির’ সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মতে, ওই ব্যক্তি ইরানের শাসনব্যবস্থায় ‘সর্বোচ্চ সম্মানিত’।
তবে, ট্রাম্প কারো নাম বলেননি। কারণ তিনি চান না ওই ‘শীর্ষ নেতাকে’ হত্যা করা হোক।
গতকাল সোমবার হঠাৎ করেই ইরানে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন ট্রাম্প। তার দাবি, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ফলপ্রসূ’ হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহের বেশি সময় পর প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কার সঙ্গে আলোচনা করছে?
ওই ব্যক্তি ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নন, এটা নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি নিহত হওয়ার পর এখন সবার দৃষ্টি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের দিকে, যিনি এখনো টিকে আছেন।
আজ মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে উঠে আসে সম্ভাব্য পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম, যাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ (পার্লামেন্ট স্পিকার)
বিশ্লেষকদের মতে, আলি খামেনি ও লারিজানি নিহত হওয়ার পর গালিবাফ কার্যত যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিন দশক ধরে ইরানি শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা গালিবাফ সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বিপ্লবী গার্ডের মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার, তেহরানের মেয়র ও পুলিশ প্রধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
তবে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে তার নাম আলোচনায় আসার পর তিনি নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খবরকে ‘ভুয়া’ বলেছেন।
মাসুদ পেজেশকিয়ান (প্রেসিডেন্ট)
সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর ২০২৪ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাকে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখা হয়।
তবে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে।
ফলে তাকে ‘শীর্ষ ব্যক্তি’ হিসেবে ধরা কিছুটা কঠিন।
আব্বাস আরাঘচি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক ২০২৪ সাল থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। গত মাসে ওমানে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি, যদিও তা যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সংঘাত নিরসনের উপায় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন দূত উটকফের সঙ্গে আরাঘচির ‘সরাসরি যোগাযোগ’ হয়েছে।
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট করা আরাঘচি মার্কিন মিডিয়ায় ইরানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
তবে তার পদমর্যাদা ট্রাম্পের বর্ণিত ‘শীর্ষ ব্যক্তি’র সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আহমাদ ভাহিদি (বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান)
সাবেক স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভাহিদি। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানে আইআরজিসির তৃতীয় সর্বাধিনায়ক তিনি। তার পূর্বসূরি মোহাম্মদ পাকপুর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনই নিহত হন এবং হোসেন সালামি ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে নিহত হন।
বলা হয়, সম্ভবত এ কারণেই এই যুদ্ধে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন তিনি।
গত ১৯ মার্চ তার নামে কেবল একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যাতে বাসিজ প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানির মৃত্যুতে তিনি শোক প্রকাশ করেন।
ইসমাইল গানি (কুদস বাহিনীর প্রধান)
২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর কুদস বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব নেন ইসমাইল গানি।
রহস্যময় এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত তিনি। গতবছর জুনের যুদ্ধে তিনি নিহত হয়েছিলেন বলে প্রথমে জানা যায়। পরে আবার জনসমক্ষে আসেন গানি। এরপর থেকে তার অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে।
বলা হয়, ২০২৪ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে চাপের মুখে পড়েছেন ইসমাইল গানি।
এই যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত ইসমাইল গানির নামে একটি মাত্র বার্তা প্রকাশ হয়েছে। যেখানে বলা হয়, ইরান শিগগির তার শত্রুদের লজ্জাজনক পরাজয় প্রত্যক্ষ করবে।
ট্রাম্পের বর্ণিত ‘শীর্ষ ব্যক্তি’ কে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের জটিল ক্ষমতার কাঠামো এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।