কর্তা নয়, জনগণের কণ্ঠ হোক সংসদ সদস্যরা

Date:

জাতীয় সংসদ ভবন থেকে কার কণ্ঠ ভেসে আসবে? সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের করতালি আর বিরোধীদলের বিরোধিতার সুর; নাকি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক, শহরের নিম্নআয়ের মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী, প্রবাসী শ্রমিকসহ সব ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের মানুষের অস্ফুট স্বর?

গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নটি এখানেই।

ভোটের ব্যালটে যে সিল দেওয়া হয় সেটা কেবল কালির নয়, আস্থার। সেই আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, শপথের পরই জনগণের এই ম্যান্ডেট দলীয় গোষ্ঠীর সম্পদে রূপ নেয়।

আব্রাহাম লিঙ্কন তার ঐতিহাসিক ভাষণে গণতন্ত্রকে বলেছিলেন, জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার। প্রশ্ন হলো, এই ‘জনগণের সরকার’ কি আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় বাস্তব, নাকি কেবল পাঠ্যপুস্তকের উদ্ধৃতি?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেখানে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায়ই হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু। কখনো কখনো তা একচ্ছত্রতার ভাষায় কথা বলে। সংসদে বিরোধী কণ্ঠ ক্ষীণ হলে গণতন্ত্রের সুরও একরৈখিক হয়ে পড়ে।

জন স্টুয়ার্ট মিল তার ‘অন লিবার্টি’তে সতর্ক করেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যতাও স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে। এই সতর্কবাণী ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হয়েছে। কারণ, গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়, এটি ন্যায়ের কাঠামো।

আমরা একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আওয়ামী লীগ যে পথে দীর্ঘদিন হেঁটেছে—ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ, সব জায়গায় রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভিন্নমতের প্রতি কঠোরতা—তার পুনরাবৃত্তি জনগণ আর চায় না। সাধারণ মানুষ সংঘাতে ক্লান্ত। তারা আর বিভাজন চায় না। তারা চায় স্বস্তির রাজনীতি। প্রতিহিংসার নয়, প্রতিযোগিতার রাজনীতি।

সংসদ যদি কেবল ‘হ্যাঁ’-এর ঘর হয়ে যায়, তাহলে সেটা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। একটি কার্যকর সংসদে ‘না’ বলার সাহস থাকতে হবে। সেখানে প্রশ্ন হবে, পাল্টা প্রশ্ন হবে, তথ্য চাইবে, জবাব চাইবে। আইন দ্রুত পাস হওয়া প্রশাসনিক সক্ষমতা হতে পারে; কিন্তু আইন নিয়ে গভীর বিতর্ক হওয়া রাজনৈতিক পরিপক্বতা।

বাংলাদেশের মানুষ আজ আরও এক জিনিস চায়—স্বচ্ছ কূটনীতি। আমরা এমন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আছি, যেখানে বড় শক্তিগুলোর টানাপড়েনের মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অর্থনীতি, শ্রমবাজার, জলবায়ু, নিরাপত্তা—সবকিছুই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। জনগণ চায় বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক হোক মর্যাদাপূর্ণ, স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর। চুক্তি হোক আলোচনার মাধ্যমে, কেবল নির্বাহী সিদ্ধান্তে নয়। সংসদে আন্তর্জাতিক সমঝোতা নিয়ে বিতর্ক হোক—এটি দুর্বলতা নয়, পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ।

শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন আজ আর কেবল কাব্যিক শব্দ নয়, এটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, তরুণদের হতাশ করে, সমাজে অবিশ্বাস বাড়ায়। একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি সৃজনশীলতাকে মুক্ত করে।

তরুণ প্রজন্ম আজ বিশ্ব নাগরিক। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুযোগ সংকুচিত হবে না। গণতন্ত্রের পরিবেশ যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, তবে অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ই শক্তিশালী হয়।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংযমের সঙ্গে ব্যবহার করা হলে স্থিতিশীলতা আসে। কিন্তু অহংকারের সঙ্গে ব্যবহৃত হলে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে।

গণতন্ত্রে ক্ষমতা ধার নেওয়া হয়, স্থায়ী মালিকানা পাওয়া যায় না। পাঁচ বছরের জন্য জনগণ যে দায়িত্ব অর্পণ করে, তা একটি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ভঙ্গ হলে আস্থা ক্ষয়ে যায়। আর আস্থা ক্ষয়ে গেলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়।

আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুনত্ব। যেখানে বিরোধীদলকে শত্রু নয়, বিকল্প হিসেবে দেখা হবে। যেখানে সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র নয়, উন্নতির উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা হবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানে শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি সংযমে নিয়ন্ত্রিত।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। সংসদ কি সংখ্যার দুর্গ হবে, নাকি মানুষের ঘর?

বাংলাদেশের মানুষ চায় এমন এক সংসদ, যেখানে তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে; এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে শান্তি ও মর্যাদা সহাবস্থান করবে; এমন এক গণতন্ত্র, যা কাগজে নয়, বাস্তবে বেঁচে থাকবে।

এখন সিদ্ধান্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। ইতিহাস অপেক্ষা করছে—তারা কি সংখ্যার আড়ালে দাঁড়াবেন, নাকি মানুষের পাশে?

 

জুবাইয়া ঝুমা, পিআর প্রফেশনাল

Popular

More like this
Related

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মুরসালীনের পদত্যাগ

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম...

বসুন্ধরায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা, পরিবারের অভিযোগ ‘মব’

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কা লাগাকে...

পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে এখন ২০০০ টাকা জরিমানা

প্রকাশ্য স্থানে ধূমপানের জরিমানার পরিমাণ ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে...

সায়েদুর রহমানকে আবারও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী নিয়োগ

পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার দুই দিন পর অধ্যাপক মো. সায়েদুর...