‘কখন যে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়বে কেউ বলতে পারে না’, মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্কে বাংলাদেশিরা

Date:

ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা। আগের দিন তেহরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ওমর ফারুক আরব আমিরাতের শারজাহ সীমান্তের কাছে দুবাইয়ের দেরার আল কুসাইসের আকাশে দেখতে পান, কিছু একটা উড়ে আসছে। অন্য অনেকের মতো তিনিও মোবাইল দিয়ে ভিডিও করতে শুরু করেন।

‘মুহূর্তেই বুঝতে পারি এটা ক্ষেপণাস্ত্র (মিসাইল)। দূরে যাচ্ছে না, আমাদের কাছেই আসছে। তখন সবাই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। কয়েক কিলোমিটার দূরে এসে সেটা পড়ে। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উড়তে দেখি,’ কথাগুলো একটানে বললেও ফারুকের কণ্ঠজুড়ে আতঙ্ক।

উন্নত জীবনের আশায় প্রায় তিন বছর আগে নরসিংদীর পলাশ থেকে আমিরাতে পাড়ি জমান ফারুক। দুবাইয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গাড়িচালক হিসেবে কাজ নেন।

বুধবার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফারুকের সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি স্টারের। তখনো তার ভেতর আতঙ্ক।

২ মার্চের সেই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ক্যাম্পের কাছেই এই ঘটনা ঘটে।’

২৮ ফেব্রুয়ারি পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানে দফায় দফায় তীব্র হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে তেহরানও ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর ‘ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন’ হামলা চালায়।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে দফা দফায় এসব হামলা চালায়। তাদের দাবি, ২৭টি মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি ইসরায়েলের তেল নফ বিমানঘাঁটি, তেল আবিবে অবস্থিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর এবং একই শহরের একটি বড় প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে।

এই হামলা-পাল্টা হামলা বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সীমিত থাকেনি।

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। এরপর লেবাননে পাল্টা হামলা চালায় ইসরায়েল।

একটু ভালো থাকার আশায় যারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছেন, তাদের সবার পরিস্থিতি অনেকটাই ফারুকের মতো। ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নন। প্রতি মুহূর্ত কাটছে ‘মৃত্যুভয়’ নিয়ে। কখন কোথায় হামলা হবে কেউ জানে না।

‘এখনো আতঙ্ক নিয়ে বের হতে হচ্ছে,’ জানিয়ে ফারুক আরও বলেন, ‘দেশে ফিরতে চাই। ছুটি চেয়েছি। এখান থেকে যদি ছুটি দেয়, আর যদি প্লেনে যাওয়ার সুযোগ পাই, দেশে চলে যাব।’

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক ফারুকের সঙ্গে কথা বলার পর কথা হয় এক ভিনদেশি শ্রমিকের সঙ্গেও।

গত এক দশক ধরে দুবাইয়ে বাস করছেন ফিলিপাইনের নাগরিক নোভি। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহতে এক শপিংমলে তিনি কাজ করেন, থাকেন আল সাতওয়া এলাকায়।

নোভি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গত ১ মার্চ রাতে তিনি যখন শপিংমলে কাজ করছিলেন, তখন বিকট শব্দ শুনতে পান। ইসরায়েল-ইরান হামলা-পাল্টা হামলার কথা তিনি আগের দিনই শুনেছিলেন।

‘হঠাৎ এমন শব্দে আমরা সবাই ভীত হয়ে পড়ি। কর্তৃপক্ষ শপিংমল বন্ধ করে দেয়। বের হয়ে জানতে পারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এরপর বাসায় চলে যাই।’

আরও বলেন, ‘আমরা কেবল যুদ্ধ থামার জন্য দোয়া করতে পারি।’

কিন্তু, এই যুদ্ধ সহসা থামার বড় লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরানে এই হামলায় খামেনিসহ তাদের শীর্ষ নেতারা কেবল নন, নিহত হয়েছে স্কুলে থাকা কয়েকশ শিক্ষার্থীও। প্রতিশোধ নিতে ইরান যখন মরিয়া হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে শোনা যায়, ইরান যদি প্রতিশোধ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন শক্তি দিয়ে হামলা করবে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এমনকি, তিনি এটাও বলেছেন যে ইরানে হামলা ৪ সপ্তাহ চলতে পারে

বুধবারও দুবাইয়ের পরিস্থিতি থমথমে বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান মো. রশিদ। নোয়াখালীর এই বাসিন্দা ব্যবসা করেন সেখানে।

তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘চার বছর ধরে দুবাই থাকি। এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।’

‘যে শহর ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকে, সে শহরে গত কয়েক দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে না,’ বলে জানান এই ব্যবসায়ী।

১ মার্চ রাতে বেশ কয়েকবার বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন জানিয়ে রশিদ আরও বলেন, ‘তখনো বুঝতে পারিনি কী হচ্ছে। পরে জানলাম, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।’

হবিগঞ্জের বাসিন্দা পারভেজ আহমেদ প্রায় ১১ বছর বাহরাইনের রাজধানী মানামায় থাকেন। সেখানেই তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মানামা থেকে একটু দূরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। কয়েকটি ভবনে আঘাত করেছে। দূরে ধোঁয়া দেখেছি।’

নিয়মিত হামলার কারণে গত কয়েক রাত ঘুমাতে পারেননি বলেও জানান পারভেজ। আরও জানান, প্রথম দিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রচণ্ড শব্দ শুনেছিলেন। সেই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সাইরেন বেজেছে। প্রতি রাতেই ১০-১২ বার সাইরেন বেজে ওঠে।

‘তবে প্রথম দিনের তুলনায় সাইরেনের শব্দ কমেছে। এখনো দোকান খোলা রেখেছি,’ বলেন তিনি।

নাটোরের বড় হরিশপুর এলাকার বাসিন্দা মো. জাহিদ হোসেন ১৫ মাস আগে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যান। চাকরি করেন আল খারিজ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রিয়াদের মানুষ আতঙ্কিত। কখন যে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে, সারাক্ষণ সেই আশঙ্কা।’

‘দোয়া করি যুদ্ধ যেন তাড়াতাড়ি থেমে যায়, পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক হয়। এখনো দেশে ফেরার কথা চিন্তা করিনি। ফ্লাইটও বন্ধ। চাইলেই ফিরতে পারবো, সেই পরিস্থিতি নেই,’ বলেন জাহিদ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত ৭টি দেশ তাদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়। এসব বিমানবন্দর কবে নাগাদ চালু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ‘ফ্লাইটরাডার-২৪’ এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি বিমানবন্দরে ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

বিমান চলাচল বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

হরিশপুর থেকেই প্রায় ১৪ মাস আগে ওয়েল্ডার হিসেবে কাজ নিয়ে সৌদির জেদ্দায় যান রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানে সবাই আতঙ্কিত। বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে।’

‘আমিও ঘরবন্দি। কখনো যুদ্ধ পরিস্থিতি এভাবে দেখিনি। খবরে শুনতাম যুদ্ধ হচ্ছে। এখানে পরিস্থিতি এমন, কখন যে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়বে, তা কেউ বলতে পারে না!’

‘প্রতিদিনই দেশ থেকে ফোন করছে। বাড়ির সবাই কান্নাকাটি করছে। আমরা যারা প্রবাসী, আমরাও আতঙ্কে-দুশ্চিন্তায় আছি। কত দিন যুদ্ধ চলবে তা তো বলা যায় না।’

‘সবাইকে একটা কথাই বলছি, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরাও দোয়া করছি। দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।’

গত বছরের শেষে দিকে নাটোরের বড়গাছা এলাকা থেকে সৌদি আরবে যান জাকিয়া সুলতানা। রিয়াদের অদূরে আল কাসিম প্রদেশের বুরাইদায় কাজ করেন তিনি।

জাকিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেশে ভালো কাজ না পেয়ে বিদেশে আসি। অথচ এখন যুদ্ধ শুরু হলো। যদিও বুরাইদায় হামলা হচ্ছে না, কিন্তু প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় হামলার তথ্য পাচ্ছি। অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, আমার দেশের মানুষও মারা যাচ্ছে।’

‘আমাদের অসহায় অবস্থা। ভাগ্যে যা আছে, তাই হবে—আর বলার কিছু নেই।’

হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৪৫ জনে পৌঁছেছে। ইরানের হামলায় ইসরায়েলে অন্তত আট জন এবং ছয় জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

এই যুদ্ধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও আমিরাতবাহরাইনে দুই বাংলাদেশি নিহত এবং কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৪ বাংলাদেশি আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কথা হয় ভারতের পাঞ্জাবের বাসিন্দা বন্দনার সঙ্গেও। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে থাকছেন দুবাইয়ে। কাজ করছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

‘এই যুদ্ধের কোনো অর্থ নেই, কোনো যৌক্তিকতাও নেই,’ বলে মন্তব্য করেন বন্দনা।

‘শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আবাসনের দাম কমে যাবে। ফলে কাজ হারানোর আশঙ্কা আছে।’

Popular

More like this
Related

৩৩ বলে অ্যালেনের রেকর্ড সেঞ্চুরি, দক্ষিণ আফ্রিকাকে গুঁড়িয়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ড

জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডের তখন দরকার ১ রান, আর সেঞ্চুরির...

সীতাকুণ্ডে ৭ বছরের শিশু হত্যা: আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী শিশুর শ্বাসনালি কেটে হত্যা...

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির সুযোগ বাংলাদেশের

ঘরের মাঠে আসন্ন তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে হারাতে...

নেপাল কি রাজা চায়?

‘রাজা আও, দেশ বাঁচাও’—এমন আওয়াজ শোনা গেছে খোদ কাঠমান্ডুর...