এত বিষণ্ণ ঈদ আগে কখনো আসেনি ছাতিয়ানপাড়া গ্রামে

Date:

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বাজার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে জয়পুরহাটগামী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ছাতিয়ানপাড়া গ্রাম। এই গ্রামের লাগোয়া আরও দুটি গ্রাম—বম্বুপাড়া ও আটশন। মাত্র সপ্তাহখানেক আগের দুই দিনের বৃষ্টিতে এই তিন গ্রামের আট শতাধিক আলুচাষি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেশির ভাগ কৃষকের আলু মাঠেই পচে গেছে। সেই পচা আলুর জমিতেই এখন ধান লাগাতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা, যা নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা।

বগুড়া-জয়পুরহাট মূল সড়ক থেকে ছাতিয়ানপাড়া গ্রামে ঢোকার কয়েকটি রাস্তা রয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে একটি মেঠো পথ ধরে এগোতেই রাস্তার দুই পাশে পচা আলুর স্তূপ চোখে পড়ে। খেতেও ভেসে উঠেছে শত শত মণ পচা আলু। পুরো গ্রামজুড়ে পচা আলুর তীব্র গন্ধ। এই গন্ধ এতটা তীব্র যে কোথাও বেশিক্ষণ দাঁড়ানোও মুশকিল।

রাস্তার পাশেই কথা হয় কৃষক কুব্বাত আলীর (৪০) সঙ্গে। পচা আলুর স্তূপ থেকে ভালো আলু বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কুব্বাত জানান, ঋণ নিয়ে সাত বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে যায়। সেখান থেকে কিছু আলু তুলে রাস্তায় রেখেছিলেন, এখন সেগুলোও পচে যাচ্ছে।

হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে এমন বিপর্যয় কখনো দেখিনি। একদিন পর ঈদ, কিসের ঈদ উদ্‌যাপন করব? ছেলেমেয়েদের কীভাবে নতুন জামাকাপড় কিনে দেব? আলুর চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। চোখের সামনে সব আলু পচে গেল। না পারলাম খেতে, না পারলাম বিক্রি করতে। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব?’

গ্রামের আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম (৩২)। তিনি ২০১৬ সালে বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির চেষ্টা করেছিলেন। চাকরি না পেয়ে ছোট দুই ভাইকে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ‘স্মার্ট কৃষি বগুড়া’ নামের একটি ফেসবুক পেজ চালান। এখানে তিনি এলাকার কৃষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরছেন।

রফিকুল জানান, এ বছর সাত বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ৪০ শতক জমির আলু ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি খেতের আলু পচে গেছে। তিনি বলেন, ‘আলু চাষের জন্য কয়েকটি এনজিও থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। এখন এই ঋণের বোঝা টানতে হবে। বাবা ১১ মাস ধরে শয্যাশায়ী, নল দিয়ে খাওয়াতে হয়। এবার ঈদের জামাকাপড় বা সেমাই-চিনি কিছুই কেনা হয়নি। এমন বিপর্যয় জীবনে আর কখনো আসেনি।’

গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, বাড়িঘর, পুকুর, ডোবা ও খালের পাশে পচা আলুর স্তূপ। নাকে আসছে পঁচা আলুর উৎকট গন্ধ। একটি জায়গায় জটলা পাকিয়ে আছেন ১৫-২০ জন কৃষক। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছিলেন শিবগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গৌতম কুমার দাস। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তিনি ৬০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করেন। তিনি জানান, যাদের আলু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, আপাতত শুধু তাদেরই তালিকা করা হচ্ছে।

সেখানেই কথা হয় কৃষক মাহমুদুল হাসান, সিরাজুল ইসলাম, নুরুন্নবীসহ কয়েকজনের সঙ্গে। সিরাজুল জানান, তার চার বিঘা জমির আলু বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে। সামান্য কিছু আলু তিনি তুলতে পেরেছিলেন।

কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হন শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান। তার সঙ্গে মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠে কৃষকেরা পচা আলুর কাদার মধ্যেই ধান লাগানোর কাজ করছেন। কোনো জমিতে কাদার চেয়ে পচা আলুই বেশি।

গ্রামের প্রায় ৩০০ চাষির আলু এভাবেই জমিতে পচে নষ্ট হয়েছে। বৃষ্টির পানি এই গ্রামের ওপর দিয়ে পাশের খালে নেমে যাওয়ায় পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে বলে জানান কৃষক হুমায়ুন কবির।

বম্বুপাড়া গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী কৃষক জামাল উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঈদের আগে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এবারের ঈদ এই গ্রামের মানুষের জন্য হাহাকার নিয়ে এসেছে। ঈদের দিন ভালো-মন্দ কিছু রান্নার উপায় নেই।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান জানান, বৃষ্টিতে শিবগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ৩০ হেক্টর জমির আলু বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়, যার মধ্যে ১০ হেক্টর জমির আলু শতভাগ নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষকেরা জানান, বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার আগে যারা আলু তুলে বিক্রি করেছিলেন, দাম না থাকায় তারাও লোকসানে পড়েছেন। মৌসুমের শুরুতে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার বেশি দর পাওয়া যায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর বগুড়ায় এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছিল ১৪ টাকা ৫০ পয়সা, যা এ বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৬৪ পয়সায়।

তবে গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জয়পুরহাট জেলা। সেখানকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৮২১ হেক্টর জমির আলু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা।

পচা আলুর জমিতে ধান চাষ

সরেজমিনে দেখা গেছে, যেসব জমিতে এখনো পানি আটকে আছে এবং পচা আলু ভেসে উঠেছে, সেখানে সদ্য লাগানো ধানের চারা লাল হতে শুরু করেছে। কিছু কিছু চারা ইতিমধ্যে পচে গেছে।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান দ্য ডেইলি স্টারকেকে বলেন, ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আলু পচে জৈব সার তৈরি হতে ১৮-২০ দিন সময় লাগে। আলু পচে যে পদার্থ নির্গত হয় সেটাও ধানের চারার জন্য ক্ষতিকর।’

তিনি পরামর্শ দেন, ‘যারা এখনো ধান লাগাননি, তাদের উচিত এই সময়টা পার করে তবেই চারা রোপণ করা। আর যারা ইতিমধ্যে ধান লাগিয়েছেন, তাদের জমি তিন-চার দিন শুকিয়ে আবার পানি দিতে হবে। এভাবে ক্রমাগত করলে ধানের চারা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।’

তবে কৃষকেরা জানিয়েছেন, বীজতলায় ধানের চারার বয়স ৩৫ দিন পার হয়ে গেছে। আরও ১৮-২০ দিন অপেক্ষা করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে না এবং বর্ষায় ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। নতুন করে চারা তৈরি করারও সুযোগ আর নেই।

Popular

More like this
Related

দেশবাসীসহ বিশ্বের সব মুসলমানকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীসহ বিশ্বের সকল মুসলমানকে ঈদুল ফিতরের...

শেষ বক্তব্যে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন আইআরজিসি মুখপাত্র নায়িনি

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল আলি...

ইরান থেকে আজ রাতে দেশে ফিরছেন ২৮০ জন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানে আটকা পরা প্রায় ২৮০...

কলকাতার ‘আজাদি’ সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরী

দুই বাংলার সাড়া জাগানো অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী কলকাতার একটি...