এক ঢুস, এক লাল কার্ড, এক অসমাপ্ত কিংবদন্তি

Date:

প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিতে যেমন একজন সর্বজয়ী নায়ক থাকেন, থাকে তার অবিশ্বাস্য শৌর্য, এবং সবশেষে এক সামান্য ভুলের কারণে তার চরম পতন, ২০০৬ সালের ৯ জুলাই বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামের রাতটি যেন সেই ধ্রুপদী নাটকেরই এক আধুনিক মঞ্চায়ন। যার অদ্বিতীয় নায়ক এবং খলনায়ক উভয়ই ছিলেন জিনেদিন জিদান।

গল্পের শুরুটা আরও বছর দুয়েক আগে। ২০০৪ সালের ইউরো কাপের ব্যর্থতার পর ক্লান্ত, শ্রান্ত জিদান যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বুটজোড়া তুলে রাখলেন, ফরাসি ফুটবলের আকাশে তখন একরাশ কালো মেঘ। ২০০৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ফ্রান্সের অবস্থা তখন দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো, চূড়ান্ত পর্বে ওঠাই যেন এক অলীক স্বপ্ন।

দেশজুড়ে যখন হাহাকার, তখন ২০০৫ সালের এক গ্রীষ্মের রাতে ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। জিদান জানালেন, গভীর রাতে এক অচেনা, রহস্যময় কণ্ঠস্বর তার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে আবার সবুজ গালিচায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ যেন এক দৈববাণী! খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি দেশ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ফিরে পেল। অবসর ভেঙে ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উঠে এলেন জিদান। জীর্ণপ্রায় ফরাসি তরীকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে পার করলেন বাছাইপর্বের বৈতরণী। শুরু হলো বিশ্বমঞ্চে এক জাদুকরের শেষ ঐন্দ্রজালিক প্রদর্শনী।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় জিদানের বয়স ৩৪। সমালোচকদের ফিসফাস, বয়সের ভারে কি জাদুকরের জাদুর কাঠি ভোঁতা হয়ে আসেনি? কিন্তু নকআউট পর্ব শুরু হতেই পুরো বিশ্ব দেখল এক অন্য জিদানকে। তিনি শুধু খেলছিলেন না, তিনি যেন মাঠের ক্যানভাসে পা দিয়ে কবিতা লিখছিলেন।

স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে তার বল নিয়ন্ত্রণের মোহনীয় রূপ দেখে মুগ্ধ হলো বিশ্ব। কিন্তু আসল সিম্ফনিটা বেজে উঠল কোয়ার্টার ফাইনালে, পরাক্রমশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে। রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা, কাফুদের সেই তারকাসমৃদ্ধ ব্রাজিল সেদিন যেন জিদানের পায়ের জাদুতে হিপনোটাইজড হয়ে গিয়েছিল। তার প্রতিটি পাস, প্রতিটি ‘পিরোয়েট’ (ঘূর্ণি), আর বলের ছোঁয়া ছিল যেন এক নিখুঁত শিল্পীর শেষ মাস্টারপিস। সেমিফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে তার ঠাণ্ডা মাথার পেনাল্টিতে ফ্রান্স যখন ফাইনালে পা রাখল, পুরো বিশ্ব তখন এক রূপকথার সমাপ্তি দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

বার্লিনের ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইতালি। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি পেল ফ্রান্স। সামনে দাঁড়িয়ে সেসময়ের বিশ্বসেরা গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন। বিশ্বকাপের ফাইনাল, স্নায়ুর চরম পরীক্ষা, এমন মুহূর্তে জিদান যা করলেন, তা স্পর্ধা নাকি নিখুঁত শিল্প, তা নিয়ে আজও তর্ক চলে। তিনি আলতো চিপে মারলেন ‘পানেঙ্কা’ শট! বল ক্রসবারে চুমু খেয়ে গোললাইন পার হলো। এমন চরম উত্তেজনার মুহূর্তে এমন ধীরস্থির ঔদ্ধত্য কেবল এক অতিমানবের পক্ষেই দেখানো সম্ভব।

কিন্তু নিয়তি অলক্ষ্যে হাসছিল। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১০ মিনিট। খেলোয়াড়দের পেশি ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু মস্তিষ্কে বিশ্বজয়ের নেশা। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনটি।

জেন্নারো গাত্তুসো বল ক্লিয়ার করলেন। বল চলে গেল অন্যদিকে। জিদান আর মার্কো মাতেরাজ্জি নিজেদের অর্ধেকের দিকে জগিং করে ফিরতে ফিরতে কিছু কথা কাটাকাটি করছিলেন। তখনও পর্যন্ত চরম উত্তেজনার কোনো আভাস ছিল না; এমনকি কথা বলতে বলতে জিদানের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখাও দেখা যাচ্ছিল।

কিন্তু তারপর, হৃদস্পন্দনের এক ভগ্নাংশে সব কিছু বদলে গেল। জিদানের সেই চিরচেনা আভিজাত্য, স্থিরতা আর সৌন্দর্য যেন এক মুহূর্তের উন্মত্ততায় হারিয়ে গেল।

জিদান হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। ঘুরে মাতেরাজ্জির দিকে ফিরলেন। নিজের সোনালি বুটজোড়া কাঁধ-বরাবর দূরত্বে শক্ত করে ঘাসের বুকে পুঁতলেন, মাথা নিচু করলেন এবং ছুটে আসা মাতেরাজ্জির বুকে প্রচণ্ড শক্তিতে এক আঘাত হানলেন। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে ছিটকে পড়লেন ইতালিয়ান ডিফেন্ডার।

চারপাশের দৃশ্যপট তখন ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। কোনো হট্টগোল নেই, খেলোয়াড়দের মাঝে কোনো ধাক্কাধাক্কি বা প্রতিশোধের উন্মত্ততা নেই। রেফারি আর বেশিরভাগ খেলোয়াড় বলের দিকে দৌড়াচ্ছিলেন বলে এই আকস্মিক ঘটনাটি অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। জিদান সম্পূর্ণ একা, বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেবল গোলরক্ষক বুফন নিজের সীমানা ছেড়ে ছুটে এসে লাইন্সম্যানের কাছে প্রতিবাদ জানালেন। গাত্তুসোও এগিয়ে এলেন, তবে স্বভাববিরুদ্ধভাবে তিনিও ছিলেন শান্ত।

রেফারি হোরাসিও এলিজনডো ছুটে এলেন, শূন্যে ভাসল সেই নিষ্ঠুর লাল কার্ড। জাদুকরের শেষ জাদুর পরিণতি হলো এক মর্মান্তিক পতন।

এরপর?

মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন জিদান। মাথার চুলহীন অংশটুকুতে স্টেডিয়ামের আলো ঠিকরে পড়ছে, কিন্তু মুখটা গভীর অন্ধকারে ঢাকা। টানেলের ঠিক প্রবেশমুখেই রাখা সোনালি রঙের বিশ্বকাপ ট্রফিটি। যে ট্রফিটিকে দ্বিতীয়বারের মতো ছুঁয়ে দেখার জন্য তিনি অবসর ভেঙে ফিরেছিলেন, সেই ট্রফির পাশ দিয়ে তিনি হেঁটে গেলেন শূন্য দৃষ্টিতে, একবারের জন্যও ফিরে তাকালেন না।

সোনালি ট্রফিটি স্থির দাঁড়িয়ে রইল, পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন সম্রাট। এই একটি দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করে রাখল মানুষের চরম অহংকার, অসীম মেধা এবং একই সাথে বুকচেরা এক মানবিক দুর্বলতার।
 

Popular

More like this
Related

হঠাৎ উপজেলা হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত ডাক্তারদের তিরস্কার

নরসিংদীর পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী...

ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমান কোথায় অবস্থান করছে, সেই...

প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছেই না

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) নিয়ে স্থবিরতা কাটছে না। ক্লাব...

আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদের দিনব্যাপী সৃজনশীল কর্মশালা

আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো দিনব্যাপী...