একুশে বইমেলা ও কিছু প্রশ্ন

Date:

চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য চেতনা-দীপ্ত অধ্যায় রচিত হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরেই। কিন্তু, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কারণে এ বছরে বিষয়টি ঠিক আগের মতো মিডিয়ায় প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না।

এ বছর ফেব্রুয়ারির ঐতিহ্যগত সব আমেজ ছাপিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চোখে পড়ছে বেশি। নির্বাচন ঠিকঠাক ভাবে হয়ে গেলে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আবার চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে রমজান শুরু।

বাংলাদেশে এই প্রথম ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হচ্ছে তা নয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ সালে পঞ্চম নির্বাচন হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি এবং ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠটি হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। এবারেরটা নিয়ে মোট সংখ্যা হবে চার।

নির্বাচনের কারণে বইমেলা পিছায়নি। ১৯৭৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলা চলেছে।

১৯৭৯ সালেরটা ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ হচ্ছে, তখন বইমেলা সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে শুরু হয়েছে। ২১ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল সেই গ্রন্থমেলার জন্য।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনিই মূলত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার উদ্যোক্তা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় চটের ওপর ৩২টি বই সাজিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বইগুলো তিনি এনেছিলেন কলকাতা থেকে। বইগুলো ছিল তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ—বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী—থেকে প্রকাশিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় আশ্রিত বাঙালি সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের লেখা ওই ৩২টি বই প্রকাশ করে স্বাধীনতার পর দেশে এসে তিনি যেভাবে সেগুলো বিক্রি শুরু করেন, সেটাই ছিল আজকের বইমেলার বীজ।

পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলা উপলক্ষে ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে তাদের প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। তাদের সঙ্গে মুক্তধারা প্রকাশনী, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স ও আরও কয়েকজন বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের প্রকাশিত বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে।

১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি আয়োজন করে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন। সেখানে তাদের নিজস্ব প্রকাশনীর বই ও ম্যুরাল প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। তখন একাডেমি প্রাঙ্গণ ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। এ সুযোগে ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নিজেদের পছন্দমতো জায়গা বেছে স্টল নির্মাণ করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। ফলে কিছু ঝামেলাও দেখা দেয়।

পরের বছর বাংলা একাডেমি একটু কঠোর হয়ে একাডেমি প্রাঙ্গণে চুনের দাগ দিয়ে প্রকাশকদের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। আয়োজনের কোনো নাম ছিল না। সে বছর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। তিনি উপলব্ধি করলেন, বইমেলা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকাশকদের সেই এলোমেলো আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করলেন বাংলা একাডেমিকে।

১৯৭৯ সালের মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। সেবারই প্রথম বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত নেয় একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বইমেলা আয়োজনের। নাম দেওয়া হলো ‘একুশে গ্রন্থমেলা’।

১৯৭৯-৮০ সাল পর্যন্ত একই নিয়মে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালে মেলার সময়কাল কমে ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন ধার্য করা হয় বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ ছিলেন প্রকাশকেরা। তাদের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে আবার আগের নিয়মে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ২১ দিন ধরে চলে ‘একুশে গ্রন্থমেলা’। ১৯৮৩ সালে প্রথম আয়োজন করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র। কিন্তু সে বছর তৎকালীন এরশাদ সরকার শিক্ষা ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দেওয়ায় নিহত হন দুইজন। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ওই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি।

এর পরের বছর জমকালো আয়োজনে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। পাঠক ও প্রকাশকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সালেই বইমেলার সময়কাল বাড়িয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলা একাডেমি।

মেলার পরিসর বাড়তে থাকলে বাংলা একাডেমি চত্বরে আর জায়গা সংকুলান হচ্ছিল না। ২০১৪ সাল থেকে মেলা বেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত চলে যায়। ২০২০ সাল থেকে মেলার নাম হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’।

‘প্রিয়জনকে বই উপহার দিন, কারণ বই জ্ঞানের প্রতীক’; ‘বই আনন্দের প্রতীক’; ‘বই ভালোবাসার প্রতীক’; ‘শিশুকাল থেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত’; ‘সাহিত্যচর্চাই পারে বিভ্রান্ত প্রজন্মকে বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে’; ‘বইয়ে যে আনন্দ অন্য কিছুতে তা নেই’; ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’—এই উক্তিগুলো গুণীজনরা অনেক আগেই বলে গেছেন।

একটা সময় উপহারের তালিকায় প্রথম স্থানে ছিল বই। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় বই-ই একমাত্র জীবন সাথী, যার বিকল্প কিছু ছিল বলে মনে পড়ে না। মানব মনোজগতের প্রধান খাদ্য হলো বই থেকে আহরিত জ্ঞান। এটাই মানুষকে আলোকিত করে, উজ্জীবিত করে এবং বস্তুকেন্দ্রিক জীবন বোধ থেকে বের করে নিয়ে আসে।

এর প্রভাব পড়ে মেলায় আগত মানুষের ওপর। যেকোনো মেলায় সমবেত হওয়ার মননগত প্রবণতা আছে বাঙালির। মেলায় মিলিত হওয়ার যে আনন্দ, তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। বইমেলায় বই কেনার গরজেই শুধু মানুষ আসেন না, আসেন সাংস্কৃতিক পীঠস্থান, উৎসবে মিলিত হওয়ার আনন্দে। বইও কেনেন।

যারা মেলা থেকে বই কেনেন, তাদের একটি অংশ কোনোদিন হয়তো বই বিপণিতে গিয়ে বই কেনেন না। এটাই বইমেলার গুরুত্ব।

বই পড়ার আনন্দ তীব্র। আনন্দ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। বই পড়ায় নেশাও আছে। তাই বই পড়া ও কেনার অভ্যাস দরকার।

বইয়ের লেখক ও পাঠকের মাঝে যোগ হন প্রকাশক, যিনি লেখকের বইকে নিয়ে যান অগণিত পাঠকের কাছে। প্রকাশনার মাধ্যমে সংগঠিত হয় বইমেলা। বিশেষত একুশে ফেব্রুয়ারির ‘প্রাণের মেলা’কে ঘিরে অধির আগ্রহে বসে থাকে সারা দেশের পাঠক সমাজ।

সময়ের আবর্তে বাংলা একাডেমির চৌকাঠ পেরিয়ে বইমেলা ঠেকেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। মেলা শুরু হলে প্রতিদিনই সেখানে আসে উপন্যাস, গল্প, শিশু সাহিত্য, কবিতা, রম্য রচনা, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদির নানা বই। গণমাধ্যমকর্মীরা ব্যস্ত থাকেন লেখক, কবি, দর্শকদের সাক্ষাৎকার নিতে।

তবে, সার্বিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত মেলা প্রাঙ্গণ অনেকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মুক্তবুদ্ধি বিকাশের পথে অন্তরায়। মিডিয়ায় নিয়মিত নানা আয়োজন হয় বইমেলার বিভিন্ন নান্দনিক ও মানবিক দিক নিয়ে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বইমেলা ‘প্রাণের মেলা’ থেকে সরে আসছে কিনা? কারণ, কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা দেওয়ার জায়গাটি অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে আসছে নিরাপত্তাজনিত কারণে। বয়োজ্যেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের আগেকার মতো মুক্ত পদচারণার উৎসাহটি আর চোখে পড়ে না। অনেকেই বলছেন, বই প্রকাশের ওপর নজরদারি ও পুলিশি তৎপরতা অনেকাংশে এই সার্বিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সেইসঙ্গে আয়োজক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে রাজনীতির কাছে। ফলে, বইমেলা প্রাণহীন হতে বসেছে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি জানিয়েছে যে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ শুরু হবে।

তবে, এ বছরের ‘অমর একুশে বইমেলা’ পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরে আয়োজনসহ ৪ দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন দেশের প্রকাশকরা। তারা জানান, বইমেলা পিছিয়ে দেওয়ার দাবিটি দেশের প্রায় সব প্রকাশকের।

রমজানের মধ্যে হওয়ায় ব্যবসায়িক ঝুঁকি বিবেচনায় মেলায় অংশগ্রহণ করবেন না ৩১ জন প্রকাশক। আর ১৫২ জন প্রকাশক মেলায় অংশগ্রহণ করার বিষয়ে একেবারেই অনিচ্ছুক।

এ ছাড়া, প্রকাশকদের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় স্টল ভাড়া মওকুফ ও সরকারি খরচে স্টলের সম্পূর্ণ কাঠামো তৈরি করে দেওয়ার দাবি জানান তারা।

সবশেষে বলা যায়, বইমেলা প্রতি বছরই আসবে এবং এর গুণগত ও ব্যবসাগত মান ধরে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, এই মেলাটি আর ১০টি মেলার মতো নয়। এর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের আবেগ জড়িত।

ড. মিহির কুমার রায়, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

Popular

More like this
Related

কারাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কোরআনের তালিমের ব্যবস্থা করা হবে: ধর্ম উপদেষ্টা

দেশের কারাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কোরআনের তালিমের ব্যবস্থা করা...

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মুরসালীনের পদত্যাগ

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম...

বসুন্ধরায় শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা, পরিবারের অভিযোগ ‘মব’

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কা লাগাকে...

পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে এখন ২০০০ টাকা জরিমানা

প্রকাশ্য স্থানে ধূমপানের জরিমানার পরিমাণ ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে...