একটি ভুল, ছয়টি বুলেট এবং একটি স্তব্ধ জাতির হাহাকার

Date:

কলম্বিয়া। লাতিন আমেরিকার একটি দেশ। যেখানে বাতাসের প্রতিটি অণুতে মিশে থাকে কফির সুগন্ধ আর বারুদের কটু ঘ্রাণ। সেই দেশে ফুটবল কেবল ২২ জন খেলোয়াড়ের বলের পেছনে ছোটা নয়; ফুটবল সেখানে এক আদিম ধর্ম, এক পৈশাচিক উন্মাদনা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কলম্বিয়া ছিল এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে, একদিকে ড্রাগ সম্রাট পাবলো এসকোবারের সন্ত্রাসের রাজত্ব, অন্যদিকে জাতীয় ফুটবল দলের জাদুকরী উত্থান। সেই উত্থানের কেন্দ্রে ছিলেন এক দীর্ঘকায় সৌম্যদর্শন যুবক। আন্দ্রেস এসকোবার। যাকে ফুটবল বিশ্ব চিনত ‘এল কাবায়েরো দেল ফুতবল’ বা ‘ফুটবলের ভদ্রলোক’ নামে। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, সেই ভদ্রলোককেই নিজের রক্ত দিয়ে লিখে যেতে হয়েছিল ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত আর বিষাদময় এক শোকগাথা।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে কলম্বিয়ার মানুষের প্রত্যাশা তখন এভারেস্টের চূড়া ছুঁয়েছিল। তার প্রেক্ষাপটটা রচিত হয়েছিল এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া। সেদিন মাঠে যা ঘটেছিল, তা ছিল এক ঐশ্বরিক জাদুকরী প্রদর্শন। কলম্বিয়া আর্জেন্টিনাকে ৫-০ গোলে চূর্ণ করে দিয়েছিল। কার্লোস ভালদেরামার সোনালী চুলের ঢেউ আর ফাউস্তিনো আসপ্রিয়ার ক্ষিপ্রতা আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছিল।

সেই জয়ের পর খোদ পেলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘কলম্বিয়াই হবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন’। বাছাইপর্বে এমন বিধ্বংসী রূপ দেখে পুরো জাতি এক ঘোরের মধ্যে ছিল। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ফুটবলের এই সোনালী ট্রফিটিই পারবে তাদের দেশের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ আর ড্রাগ কার্টেলের বদনাম ঘুচিয়ে দিতে। আর সেই রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে এসকোবার ছিলেন এক আস্থার প্রতীক। মাঠের ভেতরে ও বাইরে তার মার্জিত আচরণ তাকে করে তুলেছিল জাতীয় বীর।

১৯৯৪ সালের ২২ জুন।

ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনার রোজ বোল স্টেডিয়াম। তপ্ত রোদে পুড়ছে মাঠ, আর স্নায়ুর চাপে পুড়ছে কলম্বিয়ান খেলোয়াড়রা। প্রথম ম্যাচে রোমানিয়ার কাছে হেরে এমনিতেই খাদের কিনারে তারা। তার ওপর যুক্ত হয়েছে ড্রাগ মাফিয়া আর জুয়াড়িদের মৃত্যুর হুমকি। ড্রেসিংরুমে খবর আসছিল, হারলে খেলোয়াড়দের পরিবারের ক্ষতি করা হবে। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয় কলম্বিয়া।

ম্যাচের ৩৫তম মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রের মিডফিল্ডার জন হার্কস বাঁ প্রান্ত থেকে একটি ক্রস বাড়ান কলম্বিয়ার ডি-বক্সে। রক্ষণভাগের শেষ ভরসা হিসেবে এসকোবার স্লাইড করেন বলটি ক্লিয়ার করতে। কিন্তু মুহূর্তের এক ভগ্নাংশে ঘটে যায় সেই বিপর্যয়। বলটি এসকোবারের বুটে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলরক্ষক অস্কার করদোবাকে বোকা বানিয়ে জড়িয়ে যায় নিজেদেরই জালে। এক নিদারুণ আত্মঘাতী গোল!

এসকোবার মাঠে শুয়ে পড়লেন, দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। ক্যামেরায় ধরা পড়া তার সেই অসহায় চোখের চাহনি যেন এক অশুভ সংকেত দিচ্ছিল। গ্যালারিতে বসে থাকা তার ছোট ভাগ্নে তার মাকে (এসকোবারের বোন) জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মা, ওরা কি এখন আন্দ্রেসকে মেরে ফেলবে?’ মা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না বাবা, কলম্বিয়ার মানুষ এতটাও নিষ্ঠুর নয়।’ কিন্তু তিনি জানতেন না, মেদেলিনের অন্ধকার গলিগুলোতে তখন শাণিত হচ্ছিল জল্লাদের ছুরি।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় কলম্বিয়া। পুরো দল যখন ভয়ে বিধ্বস্ত, এসকোবার তখন এক অদ্ভুত সাহসিকতা আর সততা নিয়ে ফিরে আসেন মেদেলিনে। তিনি চাইলেই অন্য কোনো দেশে আত্মগোপন করতে পারতেন, কারণ তার সামনে এসি মিলানের মতো বড় ক্লাবের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন নিজ দেশের মানুষের মুখোমুখি হতে।

২ জুলাই, ১৯৯৪।

শোক আর বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য ২ জুলাই রাতে মেদেলিন শহরের ‘এল ইন্ডিও’ নামের একটি নাইটক্লাবে বন্ধুদের সাথে বসেছিলেন এসকোবার। সেখানে উপস্থিত ছিল পেদ্রো এবং হুয়ান গায়োন নামের দুই কুখ্যাত মাফিয়া ভাই। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কলম্বিয়ার হারে জুয়া খেলে তারা বিপুল অর্থ খুইয়েছিল।

ক্লাবের ভেতরেই তারা এসকোবারকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত কটূক্তি করতে থাকে। সেই আত্মঘাতী গোল নিয়ে শ্লেষাত্মক বাক্যবাণে জর্জরিত করা হয় তাকে। সংঘাত এড়াতে রাত তিনটার দিকে এসকোবার ক্লাব থেকে বেরিয়ে পার্কিং লটে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসেন। তিনি শুধু জানালা নামিয়ে গায়োন ভাইদের শান্তভাবে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ওই গোলটি কোনো ইচ্ছেকৃত অপরাধ ছিল না, ছিল মাঠের একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা।

কিন্তু অহংকার আর আক্রোশে মত্ত মাফিয়াদের কাছে যুক্তির কোনো স্থান ছিল না। গায়োন ভাইদের দেহরক্ষী উমবের্তো মুনোজ কাস্ত্রো দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসেন। কোনো বাক্যব্যয় না করেই পকেট থেকে একটি .৩৮ ক্যালিবারের রিভলবার বের করে এসকোবারের দিকে তাক করে সে।

নিস্তব্ধ রাতকে ফালাফালা করে গর্জে ওঠে আগ্নেয়াস্ত্র।

একবার।
দুইবার।
তিনবার।
চারবার।
পাঁচবার।
ছয়বার।

মোট ছয়টি তপ্ত সীসা বিদ্ধ হয় এসকোবারের শরীরে। রক্তের স্রোতে ভেসে যায় মেদেলিনের পিচঢালা পথ। হাসপাতালে পৌঁছানোর মাত্র ৪৫ মিনিটের মাথায়, পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছেড়ে এক চিরস্থায়ী শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন আন্দ্রেস এসকোবার।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিটি গুলি ছোঁড়ার সময় ঘাতক মুনোজ দক্ষিণ আমেরিকান ধারাভাষ্যকারদের মতো পৈশাচিক উল্লাসে দীর্ঘ টানে চিৎকার করে বলছিল, ‘গোওওওওওওওল!’

এই শব্দটি যেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গ।

তার শেষযাত্রায় মেদেলিনের রাস্তায় নেমেছিল সোয়া লাখ মানুষের শোকাতুর মহাসমুদ্র, তা আসলে কোনো ফুটবলারের বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির সম্মিলিত কান্নার প্রতিধ্বনি।

আজও যখন পাসাডেনার মাঠে বাতাস হু হু করে বয়, তখন মনে হয় যেন কোথাও সেই দীর্ঘকায় ডিফেন্ডারটি আজও দাঁড়িয়ে আছেন, যার একটি ভুল তাকে অমরত্ব দিয়েছিল বিষাদের ইতিহাসে, আর যার রক্ত আজও সবুজ ঘাসের গালিচায় এক চিরস্থায়ী শোকগাথা হয়ে রয়ে গেছে।
 

Popular

More like this
Related

ইরানে দুই সপ্তাহে ১৫ হাজারের বেশি হামলা হয়েছে: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র...

পাবনায় ইফতারের থালায় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

বিশাল এলাকা জুড়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বড় বড় থালা (খাঞ্চা)...

দেশে ফিরলেন কাতারে আটকে পড়া ৪৩০ বাংলাদেশি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থায় কাতারে আটকে পড়া মোট ৪৩০ জন...

ঢাকায় হঠাৎ শিলাবৃষ্টি

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে।আজ শুক্রবার সন্ধ্যার পর...