ইরান যুদ্ধ: বাংলাদেশের জিডিপি ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে

Date:

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নীতিগত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) তিন শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা প্রবাসী আয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাস্তব মজুরি চাপের মুখে পড়তে পারে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।

বহুল ব্যবহৃত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট (জিটিএপি) মডেল ব্যবহার করে এই বিশ্লেষণ করা হয়। মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নীতিগত ধাক্কার প্রভাব বিশ্লেষণে এই মডেল ব্যবহৃত হয়।

গবেষকেরা সম্ভাব্য ক্ষতি বোঝার জন্য তিনটি আলাদা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রথমত জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। যদি যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বা পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এর ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রের সঙ্গে জ্বালানি জড়িত। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে পুরো শিল্প খাতে।

দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিপিং ব্যাহত হওয়া। যদি যুদ্ধের কারণে সামুদ্রিক পথে ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির চাহিদা ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য পৌঁছানো না গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আর যখন রপ্তানি কমে যায়, তখন এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খাত, যেমন টেক্সটাইল, লজিস্টিকস ও সহায়ক সেবাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক মন্দা ছড়িয়ে পড়ে।

তৃতীয় বিশ্লেষণে একসঙ্গে কয়েকটি ধাক্কার প্রভাব ধরা হয়েছে, যার মধ্যে আছে-উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রবাসী আয় ১০ শতাংশ কমে যাওয়া। কারণ ওই দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন এবং যুদ্ধের প্রভাবে সেসব দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই সম্মিলিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা সবচেয়ে বড় প্রভাব।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, এই চাপগুলো একসঙ্গে কাজ করলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে অর্থনীতিতে মাঝারি থেকে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এই ফল অস্বাভাবিক নয়। যখন একসঙ্গে অনেক বাইরের চাপ আসে, তখন সেগুলো একে অন্যের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বাণিজ্যে সমস্যা হলে রপ্তানির চাহিদা কমে যায়। একই সময়ে রেমিট্যান্স কমে গেলে মানুষের আয় এবং খরচ কমে যায়।’

তার ভাষ্য, ‘এই সব প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে অর্থনীতির সরবরাহ ও চাহিদা—দুই দিকেই চাপ সৃষ্টি করে। খরচ বাড়ে এবং বাজার দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দেয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারাও খরচ কমিয়ে দেয়। এসব পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটলে অর্থনীতির ধীরগতি আরও ধীর হয়—যা একক কোনো সমস্যার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, জ্বালানির দামের ধাক্কায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে। কারণ উৎপাদন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যায়। যদি শিপিং ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়, তাহলে রপ্তানি প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।

আর সব ধাক্কা একসঙ্গে এলে রপ্তানি প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা মূলত বাড়তি খরচ, কমে যাওয়া চাহিদা এবং পরিবহন সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব।

গবেষণা অনুযায়ী, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) উৎপাদন কমতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ৫ শতাংশ পর্যন্ত, জ্বালানি-নির্ভর শিল্পখাত কমতে পারে ৪ শতাংশ, কৃষি খাত কমতে পারে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।

সেলিম রায়হান বলেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দুই বছরের মধ্যে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে এবং পরিস্থিতি খারাপ হলে ক্ষতি আরও বড় হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা মূলত রপ্তানিনির্ভর শিল্প ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এই সংযোগের কারণেই অন্য কোথাও ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশও বাইরের ধাক্কায় সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গবেষণায় কয়েকটি করণীয়ও সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন—জ্বালানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের অবকাঠামো উন্নত করা, নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া।

Popular

More like this
Related

ঈদের ছুটিতে দেখতে পারেন যে ৫ ওয়েব কনটেন্ট

প্রতি ঈদেই দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে দর্শকদের জন্য আসে নতুন...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়ার পদত্যাগ

রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া পদত্যাগ...

‘বাংলাদেশ আবারও আমাদের ভালোবাসি বলে হারিয়ে দিল’, শেহজাদের ক্ষোভ

বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ হার কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না...

কৃষিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

কৃষিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার কাজ করছে...