মধ্যপ্রাচ্যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করা ইরান যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে জরুরি আলোচনায় বসেছিলেন আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। আশপাশের কয়েকটি মুসলিম দেশের মন্ত্রীরাও এতে ছিলেন।
বুধবার যখন এই বৈঠকটি হয় ঠিক তখনই ইরানের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বড় কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছিল ইরান।
রিয়াদে শীর্ষ কূটনীতিকদের এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, এই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো।
এখন প্রশ্ন হলো এই দেশগুলো কীভাবে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলা করতে পারে? আর ইরান কি আদৌ তাদের কথা শুনবে?
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, কাতার, আজারবাইজান, বাহরাইন, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, সিরিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে অংশ নেন।
এই সবগুলো দেশই কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলে হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে যে হামলা চালিয়েছে, তাতে তিন সপ্তাহের কম সময়ে অন্তত ৯৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানও শুরু করেছে ইসরায়েল।
রিয়াদে কী সিদ্ধান্ত হলো?
এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় দিক হলো, অতীতে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা ১২টি দেশ এবার আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছে।
তারা যৌথভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে প্রতিবেশি দেশগুলোর আবাসিক এলাকা, পানি শোধনাগার, তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও কূটনৈতিক অবস্থানসহ মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ইরান।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের অবিলম্বে সব ধরনের হামলা ও প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বা হুমকি’ বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া আরব দেশগুলোয় থাকা ইরানপন্থী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করা বা বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুমকিস্বরূপ যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি তারা লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতিরও নিন্দা জানান।
বৈঠক থেকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জবাব এলেও দেশগুলো কীভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে অস্পষ্টতা আছে।
এরপর কী ঘটবে?
বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ স্পষ্ট করে কিছু বলেননি যে তার দেশ কখন ইরানকে থামাতে পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, ‘তাদের (ইরানিদের) হাতে কি এক দিন, দুই দিন নাকি এক সপ্তাহ সময় আছে? আমি সেটা আগাম জানাব না।’
তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ রাখেননি যে প্রয়োজন হলে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, ‘তাদের অনেক উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা (সামরিক) রয়েছে, যা তারা চাইলে কাজে লাগাতে পারে।’
নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, তিনি আশা করেন ইরান বার্তাটি বুঝতে পেরেছে এবং দেশটির নেতারা ‘দ্রুত তাদের হিসাবনিকাশ পরিবর্তন করবেন ও প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ করবেন।’ তবে তিনি এ-ও যোগ করেন, ‘তাদের সেই প্রজ্ঞা আছে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।’
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সময় লাগবে, কারণ আস্থা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক অমসৃণ হলেও তিন বছর আগে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তেহরান থেকে আল-জাজিরার প্রতিনিধি আলী হাশেম বলেন, সৌদি আরবের এই প্রতিক্রিয়া ‘মাত্র কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া ইরান-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমাপ্তির শুরু হিসেবে দেখা যেতে পারে।’