ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় ওয়াশিংটনের প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৩৭০ কোটি) মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। সেই হিসাবে দৈনিক তাদের খরচ হয়েছে ৯০০ (৯০ কোটি) মিলিয়ন ডলার। মূলত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণেই তাদের এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষণার বরাতে আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ শুক্রবারও তারা স্টেলথ বোমারু বিমান ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
গবেষক মার্ক ক্যানসিয়ান ও ক্রিস পার্ক বলেন, প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যয় হওয়া ৩৭০ কোটি ডলারের সামান্যই তাদের বাজেটে বরাদ্দ ছিল। ৩৫০ কোটি ডলারই ছিল বাজেট বরাদ্দের বাইরে।
তারা বলেন, এর অর্থ হলো বাজেটের বাইরে থাকা ব্যয় মেটাতে পেন্টাগনকে শিগগিরই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আবেদন করতে হতে পারে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে এবং যুদ্ধবিরোধী পক্ষের জন্য ‘বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দু’ হয়ে উঠতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সংঘাতের কারণে গ্যাসের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন আরও কমে যেতে পারে। এটি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ‘বিদেশি যুদ্ধে’ জড়াবেন না।
গবেষকরা আরও বলেছেন, অভিযানের বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ সীমিত তথ্যই প্রকাশ করেছে। তাই কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) প্রতিটি ইউনিটের পরিচালনা ও সহায়তা ব্যয়ের ওপর অনুমান করে তারা এই বিশ্লেষণ করেছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের দুই হাজারের বেশি গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। একই পরিমাণ গোলাবারুদের মজুদ পুনরায় পূরণ করতে আনুমানিক ৩১০ কোটি ডলার খরচ হবে। এতে দৈনিক ব্যয় প্রায় ৭৬ কোটি ডলার করে বাড়বে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণ ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে যাচ্ছে’, যার মধ্যে থাকবে ‘আরও বেশি ফাইটার স্কোয়াড্রন… আরও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা’ এবং ‘আরও ঘন ঘন বোমারু বিমান হামলা’।
সিএসআইএসের প্রতিবেদনে গবেষকরা বলেন, কোনো সংঘাতের শুরুতে আকাশপথের অভিযান তীব্র হলেও পরে তা কিছুটা ধীরগতিতে চলে। তবুও এখানে বাজেটের বাইরে থাকা ব্যয় বিপুল পরিমাণ হবে।
তারা আরও বলেন, এটি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণে সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযানের মতো নয়, যেখানে অধিকাংশ ব্যয় আগেই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
‘এর অর্থ হলো এক সময়ে এসে প্রতিরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। কারণ অভ্যন্তরীণভাবে এই সংঘাতের ব্যয় মেটাতে যে মাত্রার বাজেট কাটছাঁট দরকার হবে, তা রাজনৈতিক ও দাপ্তরিক দিক থেকে কঠিন হবে’, বলা হয় প্রতিবেদনে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের ব্যয় এবং সরকারের অন্যান্য অপ্রত্যাশিত খরচ মেটাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের আবেদন করতে পারে। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনও ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের শুরুতে এমনটাই করেছিল।
‘এই খাতে অর্থায়ন করা হলে তা যুদ্ধবিরোধী পক্ষের প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, যা প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রোজিল্যান্ড জর্ডান বলেন, যুদ্ধের উচ্চ ব্যয় ‘সম্ভবত কংগ্রেসের সদস্য ও সাধারণ জনগণের জন্য বিস্ময়কর হয়ে উঠছে’।
তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ব্যবহৃত টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং থার্ড ইন্টারসেপ্টরসহ ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের জন্য পেন্টাগন প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারের অতিরিক্ত বাজেট প্রস্তাব তৈরি করেছে বলে জানা গেছে।
তিনি আরও বলেন, কংগ্রেস ইতোমধ্যেই বাজেট ঘাটতি এবং ফেডারেল ঋণের সুদ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে আরও পাঁচ হাজার কোটি ডলারের আবেদন কিছু আইনপ্রণেতাকে ভাবনায় ফেলে দিতে পারে।
চলমান যুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিপুল মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর এখন পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৩৩২ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ইউনিসেফ বলেছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৮১ শিশু আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি হামলায় সেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন, আর ইসরায়েলেও ১১ জন নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতেও এখন পর্যন্ত নয়জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।