প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—তা স্পষ্ট করেননি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও ডজনখানেক যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে। ট্রাম্পের হাতে এমন একাধিক সামরিক বিকল্প রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
তিনি কি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে লক্ষ্য করে সীমিত হামলা চালাবেন? ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের চেষ্টা করবেন? নাকি তেহরানে শাসন পরিবর্তনের পথে হাঁটবেন?
এদিকে, হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান।
ট্রাম্প বলেছেন, পারমাণবিক চুক্তি না হলে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না—নির্ধারণ করবেন ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, তার সামনে বিভিন্ন সামরিক বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ওপর সরাসরি হামলার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, তিনি এমন একটি কূটনৈতিক চুক্তি চান, যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানো যায়। সেইসঙ্গে হিজবুল্লাহ ও হামাসের প্রতি সমর্থনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ইরান এসব শর্ত মানতে রাজি হয়নি।
ওমান ও সুইজারল্যান্ডে দুই দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তাতে অবস্থান কাছাকাছি আসেনি। বৃহস্পতিবার আবারও সুইজারল্যান্ডে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান ‘আত্মসমর্পণ’ না করায় ট্রাম্প বিস্মিত হয়েছেন।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো সীমিত সংঘাত চায়—যা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ জটিলতায় ফেলবে না।
তার মতে, ইরান এখন একটি স্বল্পমেয়াদি কিন্তু উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন সামরিক অভিযানের আশঙ্কা করছে, যা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো দুর্বল করবে। এটি ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া ক্ষমতার সমীকরণও বদলে দিতে পারে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করেছে।
জানুয়ারিতে ইরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। ইরানি জনগণকে সহায়তার হুমকি দিলেও ট্রাম্প সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি।
গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে তার উদ্যোগে হওয়া যুদ্ধবিরতির উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির গতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, ইরানে শাসন পরিবর্তন হলে সেই গতি আরও বাড়বে।
তবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সহিংস অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা যুদ্ধ ঘোষণার সাংবিধানিক ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, নয়টি ডেস্ট্রয়ার ও তিনটি ফ্রিগেট।
বিশ্বের বৃহত্তম রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে। বিমানবাহী রণতরীগুলোতে থাকা অসংখ্য বিমানের পাশাপাশি ডজনখানেক যুদ্ধবিমান ও হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
এসব বাহিনী ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
মার্কিন কূটনীতি বিষয়ক সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হাস বলেন, সংঘাত ইরানের সরকারের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা অনিশ্চিত। এতে সরকার দুর্বলও হতে পারে, আবার আরও শক্তিশালীও হতে পারে। শাসনব্যবস্থা পতন হলে তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, সেটিও অজানা।
সিনেট শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পতন হলে কী ঘটবে তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। কেবল আশা করা যায়, ভেতর থেকে কোনো পরিবর্তনকামী নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন উপসাগরীয় আরব রাজতান্ত্রিক দেশগুলো হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য হতে পারে তারাই।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি জটিল লক্ষ্যবস্তু। শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালানো হলে দেশের ভেতরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো সেখানে বহুমুখী ও বিস্তৃত।