ইরানে এই মুহূর্তে মার্কিন হামলা কেন সহজ নয়

Date:

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা দেশটির পুরো শাসনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো এতটাই জটিল ও বহুমাত্রিক যে, কেবল বাহ্যিক সামরিক আঘাতে দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আজ শনিবার মানবাধিকারকর্মীদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের দেশব্যাপী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করেছেন।

ইরানের মতো ইসলামিক রিপাবলিক একটি দেশের টিকে থাকার মূল শক্তি হলো এর ‘জোরপূর্বক সংহতি’। সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ফলে বৈধতা ক্ষয় হলেও বিপ্লবী গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে কাজ করে যায়।

যা ইরানের ভেতরে চলমান বিক্ষোভ দমন এবং বাইরে সম্ভাব্য যুদ্ধ কিংবা সামরিক হামলা প্রতিরোধ—দুই ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির ‘আলোচনার পথ খোলা থাকলেও, যুদ্ধের জন্য আমরা প্রস্তুত’ বক্তব্য সেটিই ইঙ্গিত করে।

প্রচলিত অনেক রাষ্ট্র যে বাহ্যিক ধাক্কায় ভেঙে পড়ত, মূলত এই সংহতির জোরেই ইরানের পক্ষে ওই ধাক্কা সামাল দেওয়া সক্ষম।

৯ কোটির কিছু বেশি জনসংখ্যার ইরান কোনো একক ক্ষমতাকেন্দ্রভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। এটি একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা, বিপ্লবী গার্ড, গণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

দেশটির আইনসভা বা মজলিশের অধিকাংশ সদস্য দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনির প্রতি অনুগত। দেশটির ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও ইরান সেনাবাহিনী (আরতেশ) দুটি ভিন্ন সামরিক বাহিনী। বিকল্প কমান্ড চেইন দেশটির শাসন নকশার অংশ।

ফলে নেতৃত্বে আঘাত হানা বা ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা এখানে কম। যা সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ঘটেছে। উল্টো এমন আঘাত এলে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকিই বেশি।

ইরান সংসদের স্পিকার বাকের ঘালিবাফ গত রোববার হুঁশিয়ারি জানান, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পাগলাটে প্রেসিডেন্টের জন্য আমার বার্তা আছে, ইরান আক্রমণের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। কোনো রকম হামলা হলে দখলে থাকা ভূমি ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো হবে আমাদের আক্রমণের লক্ষ্য। উত্তর দিতে হলে আমরা নরম থাকবো না।’

এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ধরনের রাজনৈতিক দোটানায় পড়েছেন। একদিকে তার প্রশাসনের ভেতরে এমন গোষ্ঠী আছে, যারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানে শাসন পরিবর্তন চায়। অন্যদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকরা নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সামরিক জটিলতায় জড়াতে নারাজ।

ফলে ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠছে সীমিত, স্বল্পমেয়াদি এবং দায়হীন সামরিক পদক্ষেপ।

আঞ্চলিক রাজনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্পগুলো সীমিত করে দিচ্ছে। ইসরায়েল চাইছে ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা নিক। তবে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানসহ গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। আমিরাতের সঙ্গেও ইরানের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিশ্চিত করা, যাতে আমরা আমাদের জনগণের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে আমাদের সম্পদগুলো কাজে লাগাতে পারি।’

তাদের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া ইরানে বড় আকারের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।

দোহা ইনস্টিটিউটের ক্রিটিকাল সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহানাত সেলুম আল জাজিরাকে বলেন, ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের শীর্ষ কর্তারা মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার নন।’

ট্রাম্প নিজেও বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করেছেন। তিনি একদিকে বলেছেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াবে। আবার একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছেন এবং দাবি করছেন যে সহিংসতা কমছে। এই দোলাচল তার প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র চায় একটি বাস্তববাদী ইরান—যেটি পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করবে, আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমাবে এবং চীনের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্যমতে খামেনি বলেছেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র। তারা চায় ইরানকে গিলে খেতে। সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অবদমিত করে রাখতে।’

ধারণ করা হচ্ছে, ইরানের শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন নয়, বরং আচরণগত পরিবর্তনই যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য।

এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বিবিসি জানায়, ট্রাম্প সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিকল্পগুলো নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে সীমিত আকারের বিমান হামলাই সবচেয়ে সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে বিপ্লবী গার্ডের নির্দিষ্ট স্থাপনা বা অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

তবে এর ঝুঁকিও কম নয়। এতে ইরান সরকার কঠোর দমননীতি বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পাবে, জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে উঠতে পারে। এমনকি আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা বাড়বে।

নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা বা দীর্ঘস্থায়ী বিমান অভিযান—এই দুটি বিকল্পই তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক ও অপেক্ষাকৃত কম বাস্তবসম্মত। এগুলো সংঘাতকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এমন উত্তেজনার সৃষ্টি হতে পারে, যা কোনো পক্ষই সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

অধ্যাপক সেলুমের মতে, ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ও সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মিলিশিয়া গ্রুপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বা মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে সক্ষম।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য মতে, সাইবার হামলা ও ইলেকট্রনিক বিঘ্ন তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান বিকল্প হলেও, এর প্রভাব অনিশ্চিত এবং সাধারণত সাময়িক। নেটওয়ার্কভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে ইরান এসব বিঘ্ন এড়িয়ে চলার সক্ষমতাও রাখে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাইরের চাপ খুব কম ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনে। বরং তীব্র বহিরাগত চাপ শাসনব্যবস্থার কঠোর অংশকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো ও বিশ্লেষক অ্যানা জ্যাকবস খালাফ আল জাজিরাকে বলেন, ‘সম্ভাব্য অরাজকতা ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি নিয়ে গালফ দেশগুলো উদ্বিগ্ন। এমনিক ইরানে আরও চরমপন্থী শক্তির ক্ষমতায় আসার আশঙ্কা নিয়ে।’

ইরানে টেকসই পরিবর্তনের একমাত্র পথ হলো অভ্যন্তরীণ বিভাজন—বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করা।

যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে চায়, তবে নাটকীয় সামরিক অভিযানের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার পথেই এগোতে হবে। বিশেষ করে কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইরান হয়তো বর্তমান বিক্ষোভ দমন করতে পারবে, কিংবা নিজেকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করেও টিকে থাকতে পারে। তবে অর্থনৈতিক সংকট ও জনরোষ দূর না হলে ক্ষোভ চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যেও এই সুর প্রতিফলিত হয়।  

সে জন্য প্রয়োজন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সংস্কার—আর তার জন্য ইরানের শাসনব্যবস্থাকেও আরও বাস্তববাদী পথে সামনের দিকে এগোতে হবে।

Popular

More like this
Related

কুয়েতে প্রতি ৩৪ মিনিটে একটি বিয়ে, ৭৫ মিনিটে একটি তালাক

কুয়েতে প্রতি ৩৪ মিনিটে একটি বিয়ে এবং প্রতি ৭৫...

শুধু টেপ-টেনিস খেলে বিপিএলে পৌঁছে গিয়েছি, এটা সত্যি নয়: সাকলাইন

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বাদশ আসরের নিলামের সবচেয়ে বড়...

আমা দাবলামের চূড়ায় লাল সবুজের পতাকা উড়ালেন পাবনার তৌকির

হিমালয়ের ২২ হাজার ৩৪৯ ফুট উচ্চতার দুর্গম আমা দাবলামের...

একের পর এক ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস, ট্রাম্পের নিশানায় যেসব মিত্ররা 

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে...