রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্রমেই উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর সংঘাতে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা ও হামলাকারী ড্রোনের ঝাঁকে ইউক্রেনের আকাশ সরব। চালকবিহীন নৌযান কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌবাহিনীকে বড় ক্ষতির মুখেও ফেলেছে।
শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো হলেও স্থলযুদ্ধে বড় আকারে সশস্ত্র রোবট ব্যবহার শুরু করেছে ইউক্রেন। আর রাশিয়া আগে থেকেই এগুলো ব্যবহার করছে।
চালকবিহীন স্থলযান বা ইউজিভি (আনম্যানড গ্রাউন্ড ভেহিকল), যাকে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ‘গ্রাউন্ড রোবট সিস্টেম’ বলে, ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
এসব রোবট রুশ হামলা ঠেকাতে সাহায্য করেছে। কিছু ক্ষেত্রে শত্রু সেনাদের বন্দি করার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ও রুশ হামলাকারী রোবট মানুষের উপস্থিতি ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কে–২ ব্রিগেডের সদস্য ওলেক্সান্দর আফানাসিয়েভ বিবিসিকে বলেন, ‘রোবট যুদ্ধ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।’
তার দাবি, তিনি বিশ্বের প্রথম ইউজিভি ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই ব্রিগেড তাদের রোবটগুলোর ওপর কালাশনিকভ মেশিনগান বসিয়ে ব্যবহার করছে। আফানাসিয়েভ বলেন, ‘যে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পদাতিক সৈন্য যেতে ভয় পায়, সেখানে এগুলো গুলি চালাতে পারে। একটি ইউজিভি নিজের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে ফেলতেও প্রস্তুত।’
তার ব্যাটালিয়ন বিস্ফোরকবোঝাই ব্যাটারিচালিত ‘কামিকাজে’ নামিক ইউজিভি ব্যবহার করছে। এগুলো দিয়ে শত্রুর অবস্থান ও ঘাঁটি ধ্বংস করা হচ্ছে। আকাশে উড়ন্ত ড্রোনের মতো গুঞ্জনধ্বনি না থাকায় এগুলো হামলার আগে শত্রুকে সতর্কও করে না।
৩৩তম স্বতন্ত্র মেকানাইজড ব্রিগেডের ট্যাংক ব্যাটালিয়নের উপকমান্ডার যার কলসাইন আফগান বলেন, একটি মেশিনগান-সজ্জিত ইউক্রেনীয় ইউজিভি অতর্কিতে একটি রাশিয়ান সৈন্যবাহী যান আক্রমণ করেছিল। আরেকটি রোবট কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি ইউক্রেনীয় অবস্থান রক্ষা করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে আফগান স্বীকার করেন, এসব রোবটের স্বায়ত্তশাসনের সীমা রয়েছে। নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এই সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘আধুনিক ইউজিভি আংশিক স্বয়ংক্রিয়। তারা নিজেরাই চলতে পারে এবং শত্রুকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত এখনো মানুষ বা অপারেটরই নেন।’
কারণ, রোবট ভুল করে কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই রাখা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্বে থাকা অপারেটররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব রোবট নিয়ন্ত্রণ করেন।
ইউক্রেনের ইউজিভিগুলো মেশিনগানের পাশাপাশি গ্রেনেড লঞ্চারেও সজ্জিত হতে পারে। এগুলো ল্যান্ডমাইন বসানো বা কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক বসাতেও ব্যবহৃত হয়।
তবে বেশির ভাগ চালকবিহীন যান এখনো সরঞ্জাম সরবরাহ এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার মতো কাজেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে দেশটির রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি মনে করেন, সশস্ত্র ইউজিভির ভূমিকা দ্রুত বাড়বে।
লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসে ভবিষ্যতের যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আক্রমণাত্মক ইউজিভিগুলো শুধু এককভাবে নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রিত বড় ড্রোন ঝাঁকের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হবে।
তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে ডজন ডজন, এমনকি শত শত আরও বুদ্ধিমান ও সস্তা ড্রোন আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে একযোগে হামলা চালাবে।’
এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পেছনে বড় কারণ প্রয়োজন। আকাশে ড্রোনের উপস্থিতির কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের থাকা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ইউক্রেনের তথাকথিত ‘কিল জোন’ যোগাযোগরেখা থেকে ২০–২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
আফানাসিয়েভ বলেন, পদাতিক বাহিনীকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়, তবে ‘তাদের ইউজিভির সহায়তা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেন রোবট হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত সৈন্য হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে না।’
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী বর্তমানে তীব্র জনবল সংকটে রয়েছে এবং নিহত সৈন্যদের পরিবর্তে নতুন সদস্য নিয়োগ করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও যুদ্ধোপযোগী ইউজিভি তৈরি করছে।
রুশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যানে ফ্লেমথ্রোয়ার বা ট্যাংকে ব্যবহৃত ভারী মেশিনগান বসানো যায়। এটি পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে।
রাশিয়ান সেনাবাহিনী ‘লিয়াগুশকা’ বা ‘ব্যাঙ’ নামক যানও ব্যবহার করছে, যা ইউক্রেনীয় অবস্থান ধ্বংসে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় ইউজিভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডেভড্রয়েডের প্রধান নির্বাহী ইউরি পোরিতস্কি মনে করেন, খুব শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ ও ইউক্রেনীয় রোবট একে অপরের মুখোমুখি হবে।
তার কোম্পানি গত বছর সেনাবাহিনীর জন্য শত শত ‘স্ট্রাইক ড্রয়েড’ তৈরি করেছে।
পোরিতস্কি বলেন, ‘রোবট যুদ্ধ শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো লাগতে পারে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এটি কল্পনা নয়, বাস্তবতা।’
তার কোম্পানি এখন এমন প্রযুক্তি তৈরির কাজ করছে যাতে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে রোবটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘাঁটিতে ফিরে যেতে পারে।
ভবিষ্যতে এসব রোবটকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে তারা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে নজরদারি বা যুদ্ধ পরিচালনা করে নির্দিষ্ট সময়ে ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারে।
ইউক্রেনের আরেক ইউজিভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেনকোর পরিচালক মাকসিম ভাসিলচেঙ্কো জানান, ২০২৫ সালে তাদের কোম্পানি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য ২ হাজারের বেশি ইউজিভি তৈরি করেছে।
তার আশা, ২০২৬ সালে এই চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার ইউনিটে পৌঁছাবে, যার অন্তত ১০–১৫ শতাংশ হবে অস্ত্রসজ্জিত।
ভাসিলচেঙ্কো বলেন, ‘স্ট্রাইক ড্রোন বা ইউজিভি যুদ্ধক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠবে—কোনো সন্দেহ নেই।’
তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে রোবট মানুষের আকৃতিতেও যুদ্ধে অংশ নিতে পারে। তার ভাষ্য, ‘তখন আর এটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী থাকবে না।’