আফগান তালেবানের রহস্যপুরুষ কে এই হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা?

Date:

‘অপারেশন গজব লিল–হক’ নামে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তান। এতে উভয় দেশ থেকেই হতাহতের বহু খবর আসছে। এরমধ্যেই তালেবান প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তান ও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকেই দেশটিতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান বলে ধরা হয়। জনসমক্ষে খুব কমই দেখা যায় তাকে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় অদৃশ্য থেকেও তিনি পরিচালনা করছেন ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশটি।

‘আলেম’ থেকে তালেবানের নেতৃত্বে

১৯৬০-এর দশকে আফগানিস্তানের কান্দাহার অঞ্চলের একটি ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আখুন্দজাদা। তিনি মূলত শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে ধর্মীয় শিক্ষা ও বিচারিক কার্যক্রমে যুক্ত হন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানের প্রথম শাসনামলে শরিয়াহ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেসময় কঠোর ইসলামি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।

যেভাবে তালেবান প্রধান হলেন

২০১৬ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় তৎকালীন তালেবান প্রধান মোল্লা আখতার মোহাম্মদ মনসুর নিহত হলে সংগঠনটির নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে আপসযোগ্য, ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে বিতর্কমুক্ত ব্যক্তি হিসেবে আখুন্দজাদাকে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা বা ‘আমিরুল মুমিনিন’ ঘোষণা করা হয়।

তার নেতৃত্বে তালেবান নতুন করে সংগঠিত হয় এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পর ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখল করে।

২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করার পরও আখুন্দজাদা রাজধানীতে বসবাস না করে কান্দাহার থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানা যায়। তিনি খুব কমই জনসমক্ষে বক্তব্য দেন এবং অধিকাংশ সিদ্ধান্ত লিখিত ফরমানের মাধ্যমে জারি করেন। অনেকেই মনে করেন, তালেবান সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তার হাতেই কেন্দ্রীভূত।

আখুন্দজাদা বেশি আলোচিত নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে। মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শিক্ষা বন্ধ, নারীদের বহু কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা এবং জনজীবনে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব সিদ্ধান্তকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয়। তবে তালেবান নেতৃত্ব দাবি করে, তাদের নীতিমালা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী নির্ধারিত।

আখুন্দজাদাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্য হলো তার অদৃশ্য উপস্থিতি। বহু আফগান নাগরিক, এমনকি তালেবানের অনেক সদস্যও তাকে সরাসরি কখনো দেখেননি বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে।

তবুও বাস্তবতা হলো, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, সামাজিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তিনিই বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্ব

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তালেবান সরকারের সম্পর্ক, মানবিক সহায়তা, অর্থনৈতিক স্বীকৃতি এবং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা, সবকিছুই অনেকাংশে নির্ভর করছে আখুন্দজাদার নীতিগত অবস্থানের ওপর।

জনসমক্ষে প্রায় অনুপস্থিত থাকলেও বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এখন এক কেন্দ্রীয় নাম, যার সিদ্ধান্ত আফগানিস্তানের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
 

Popular

More like this
Related

ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহত ২০১, আহত ৭৪৭

ইরানে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭...

ইরানে ইতিহাসের ‘বৃহত্তম বিমান হামলা’র দাবি ইসরায়েলের

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর হামলায় নিজেদের...

শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েও পাকিস্তানের বিদায়, সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড

৮ উইকেটে ২১২ রানের বড় পুঁজি পাওয়া পাকিস্তানকে সেমিফাইনালে...

খামেনির পতন হলেও যেভাবে চলতে পারে ইরানের শাসনব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা যে যুদ্ধে রুপ...