‘আজাদ’ ভাষ্যে ভাষা আন্দোলন

Date:

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণ কাল। পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনার প্রথম সম্মিলিত প্রতিবাদ। যে পথ বেয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে হাজার বছরের স্বপ্নভূমি—বাংলাদেশ। বাঙালি জাতিসত্তা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি অনন্য ঘটনা। যার প্রতিফলন ছিল রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনে। সংবাদপত্র এর বাইরে নয়। একুশে প্রতিফলিত হয়েছিল সংবাদপত্রের পাতাতেও। ১৯৫২ সালের সংবাদপত্রের কথা বললে সবার আগে আলোচনায় আসে ‘দৈনিক আজাদ’।

বাংলা ও বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে ‘আজাদ’ এক বিশেষ নাম। এই সংবাদপত্র ছাড়া শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনাও প্রায় অসম্ভব। অবিভক্ত ভারতে কলকাতা থেকে সংবাদপত্রটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে। শুরুতে ‘আজাদ’ ছিল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থক সংবাদপত্র। ‘আজাদ’-কে এক সময় বাংলা ও আসামের মুসলমানদের মুখপত্র মনে করা হতো। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮)। সংবাদপত্রটি আকরাম খাঁর ‘আজাদ’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল।

মওলানা আকরাম খাঁ নিজেও ছিলেন সক্রিয় মুসলিম লীগ নেতা। ১৯৪১-১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ‘আজাদ’ ছিল আট পাতার প্রকাশনা। সংবাদপত্রটির বিখ্যাত বার্তা সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ মোদাব্বের (১৯০৮-১৯৮৪)। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সংবাদপত্রটি কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কলকাতা থেকে সংবাদপত্রটির শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালের ১২ অক্টোবর। 
এরপর ঢাকার ঢাকেশ্বরী রোডের পাশে একটি প্লট লিজ নিয়ে সংবাদপত্রটির অফিস গড়ে ওঠে। সেখান থেকেই সংবাদপত্রটি নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। সেই সময় ‘আজাদ’-ই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সংবাদপত্র। ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর সংবাদপত্রটির সম্পাদক হন আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮)। বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থানের কারণে ‘আজাদ’ পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে। যার মধ্যে প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। ভাষার দাবিতে পুলিশের গুলিতে ছাত্রদের প্রাণ বিসর্জনের সেই ঘটনা ‘আজাদ’ প্রকাশ করেছিল অত্যন্ত সাহসিকতা ও দায়িত্বের সঙ্গে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি প্রতিফলন ছিল ২১ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রে। এদিন ‘আজাদ’-এর প্রথম পাতার দ্বিতীয় কলামে প্রকাশিত হয়েছিল—‘ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি’ শিরোনামের সংবাদ। এই সংবাদের সাবহেড ছিল—‘এক মাসের জন্য শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ’। এই সংবাদে বলা হয়, ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারি করে শহরে এক মাসের জন্য সভা শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেছেন।

এখানে একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৫২ সালে ‘আজাদ’-সহ যতগুলো সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো, সেগুলোর প্রায় সবগুলোতেই সাধু ভাষারীতি অনুসরণ করা হতো। ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবার ‘দৈনিক আজাদ’-এ প্রকাশিত সংবাদে সাধু ভাষায় লেখা হয়—আদেশ জারির কারণস্বরূপ তিনি বলেন যে, একদল লোক শহরে সভা, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের প্রয়াস পাওয়ায় এবং তদ্বারা জনসাধারণের শান্তি ও নিরাপত্তা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এই ব্যবস্থা অবিলম্বিত হইয়াছে। (আজাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)

সাংবাদিকতার পরিভাষায় টেলিগ্রাম বলতে একটি বিশেষ অতি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাকে বোঝায়, যা সাধারণত অতি গুরুত্বপূর্ণ খবরের ক্ষেত্রে বিকেল বা সন্ধ্যায় প্রকাশিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ভাষার অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের পর ‘দৈনিক আজাদ’ প্রকাশ করে সেই সাহসী টেলিগ্রাম। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘আজাদ’ ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের মুখপত্র। তারপরও বিশেষ পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রটি তাদের আদর্শিক অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাহসী ভূমিকা রাখে। প্রকাশ করে—ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত—শিরোনামের টেলিগ্রাম। যদিও সেই কপিগুলো বেশি বণ্টন করা সম্ভব হয়নি। কারণ ‘আজাদ’-এর এই কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করেছিল নুরুল আমিনের সরকার।

গুলিতে ছাত্রহত্যার খবর ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আজাদ’ প্রকাশ করে আট কলামের ব্যানার হেডলাইনে। পুরো সংবাদপত্রজুড়ে প্রধান শিরোনাম ছিল—ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ। যার সাবহেড ছিল—বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রসহ চার ব্যক্তি নিহত ও ১৭ ব্যক্তি আহত।

এই খবরের বিস্তারিত অংশে বলা হয়—গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলি চালানোর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম-এ ক্লাসের ছাত্র মোহাম্মদ সালহুদ্দীন (২৬) (প্রকৃত নাম রফিক উদ্দিন আহমদ হবে। সে সময়ে প্রথম শহীদের নাম আজাদ এ ভুল করে মোহাম্মদ সালহুদ্দীন ছাপা হয়েছিল) ঘটনাস্থলে নিহত ও বহু সংখ্যক ছাত্র ও বিক্ষোভকারী আহত হয়। আহতদের মধ্যে ২০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত্রি ৮টার পর আহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল জব্বার (৩০), আবুল বরকত (২৫) ও বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিকুদ্দীন আহমদের (২৭) মৃত্যু হয়। আহতের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়াছে। (আজাদ, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)

এই সংবাদে পরের দিকে আরও ছাপা হয়—এই দিন সকাল ৯টা হতে শহরের স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীগণ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে ও ১৪৪ ধারা জারীর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শান্তিপূর্ণভাবে এক সভার আয়োজন করে। পরিষদে চলতি অধিবেশনে যোগদানকারী সদস্যদিগকে রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে পূর্ব্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাব সম্পর্কে ওয়াকেফহাল করানোই এই সভার উদ্দেশ্য ছিল বলিয়া সভার উদ্যোক্তাদের নিকট হইতে জানা গেছে। (আজাদ, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)

এই খবরে আরও বলা হয়—বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা চলিতে থাকার সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চতুর্দিকে রাইফেলধারী পুলিশ মোতায়েন থাকিতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও বিভাগীয় ডীনগণ ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হইতে ছাত্রগণ বেলা ১১টায় গেটে আসিয়া উপস্থিত হয় এবং তাহাদিগকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হইয়া রাস্তায় বাহির হইতে দেখা যায়। এ সময় পাহারারত পুলিশগণ বিশ্ববিদ্যালয় গেটে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ফলে কিছু সংখ্যক ছাত্র দৌড়াইয়া রাস্তার অপর পার্শ্বে ময়দানে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং কিছু সংখ্যক ছাত্রকে দৌড়াইয়া মেডিকেল কলেজের দিকে যাইতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত অবশিষ্ট ছাত্রগণ ঘেরাও করা এলাকার মধ্যে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপের বিরুদ্ধে দারুণ বিক্ষোভ প্রকাশ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের (যিনি এই ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন) নিকট পুলিশের এই আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। (আজাদ, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)

প্রধান এই সংবাদের পরের দিকে ঢাকা মেডিকেলের হোস্টেলে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ১২ নম্বর শেডের সামনে রফিক উদ্দিনের শহীদ হওয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়। এছাড়া এই প্রধান সংবাদে ছিল ছাত্র হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরবাসীর মেডিকেল কলেজের দিকে ছুটে আসার ঘটনা। ‘আজাদ’-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার ঘটনার পুরো শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিয়োজিত করা হয় সেনাবাহিনী।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘আজাদ’-এর সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ছিলেন একজন গুণী সম্পাদক, রাজনীতিবিদ ও তখনকার পরিষদ সদস্য। যিনি পুলিশের গুলিতে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি সে বিষয়ক একটি সংবাদও প্রথম পাতায় প্রকাশ করেছিল ‘আজাদ’, যেটার শিরোনাম ছিল—পরিষদ হইতে আজাদ সম্পাদকের পদত্যাগ। এদিকে ২২ ফেব্রুয়ারিতেই ‘আজাদ’ প্রকাশ করে একটি সম্পাদকীয়, যার শিরোনাম ছিল—তদন্ত চাই।

বেশ কড়া ভাষায় লেখা এই সম্পাদকীয়তে বলা হয়—গতকল্য ঢাকার বুকে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের নিকটে যে শোচনীয় দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা যেমন মর্মন্তুদ ও তেমনি অবাঞ্ছিত। আইন অমান্য, নিয়ম ভঙ্গ, উচ্ছৃঙ্খলা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু এইসঙ্গে একথাও সত্য যে, আইন অমান্য হওয়ার মত ক্ষেত্র সৃষ্টি কারও কোন গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত নয়।

বিগত দুই দিনের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবীর সমর্থনে ছাত্র প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে প্রায় একপক্ষ পূর্ব্বে ধর্মঘট পালন করিবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হইয়াছিল। গত পরশু তারিখে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হঠাৎ ১৪৪ ধারা জারী করিয়া শোভাযাত্রা ও সভা সমিতি বন্ধ করিয়া দেন। গতকাল এই ব্যাপারকে কেন্দ্র করিয়া ছাত্র বিক্ষোভ হইয়াছে, টিয়ার গ্যাস ও গুলী চালাইয়াছে, কতকগুলো হতাহতও হইয়াছে। (সংক্ষিপ্ত অংশ) (আজাদ, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)

সম্পাদকীয়টির পরের দিকে ছাত্রদের দমাতে গুলি বর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। উল্লেখ করা হয়—এ ধরনের বিক্ষোভ দমনে টিয়ার গ্যাসই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অংশ হিসেবে গুলি করেছে। আর গুলি ছোড়া হয়েছে শরীরের উপরের অংশে—যার উদ্দেশ্য ছিল হত্যা করা।

শুধু ২২ বা ২৩ ফেব্রুয়ারিই নয়, এরপরের কয়েকদিনও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাষা আন্দোলনের খবর প্রকাশ করেছিল ‘আজাদ’। এতে যেমন ছিল ছাত্র হত্যার বিস্তারিত তথ্য, ছিল প্রতিবাদ ও ভাষার অধিকারের যৌক্তিকতা। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের মুখপত্র হলেও ‘আজাদ’ ভাষা আন্দোলনের সংবাদ যেভাবে প্রকাশ করেছিল তা সত্যিই প্রশংসনীয়, ঐতিহাসিক।

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Popular

More like this
Related

ভেনেজুয়েলা যত সহজ ছিল, ট্রাম্পের ইরান অভিযান তত সহজ হবে কি?

পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার চুক্তিতে ইরানকে রাজি করাতে দেশটিতে...

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও কি ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারেন?

ট্রাম্প গত বছর ‘লিবারেশন ডে’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে...

ঢালাও শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা পণ্যের ওপর বিশ্বব্যাপী শুল্ক ১০...

অমর একুশের দিনে এফডিএফের বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস উপলক্ষে ফরিদপুরের স্কুল শিক্ষার্থীদের...