অনেক প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া নির্বাচন

Date:

১৯৪৪ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে দাঁড়িয়ে উইনস্টন চার্চিল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, গণতন্ত্র আসলে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রতি জানানো সব শ্রদ্ধার মূলে রয়েছেন সেই সাধারণ নারী ও পুরুষ, যারা ছোট একটি বুথে ঢোকেন এবং পেনসিল দিয়ে এক টুকরো কাগজে ছোট্ট একটি ক্রস চিহ্ন আঁকেন।’

চার্চিল যে সাধারণ নারী ও পুরুষের কথা বলেছিলেন, বাংলাদেশের নাগরিকেরা—সেই ‘ছোট্ট’ মানুষেরা—আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোট দিতে ছোট ছোট বুথে প্রবেশ করবেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি নির্বাচনে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিতে ব্যালটে সিল দেবেন তারা।

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর জাতি এমন একটি নির্বাচনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। ভোটের ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে টানটান উত্তেজনা ভোটার, রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। বহু বছর পর কে ক্ষমতায় আসবে, তা নিয়ে এক ‘গৌরবময় অনিশ্চয়তা’ কাজ করছে সবার মনে।

সাংবিধানিকভাবে প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগের নির্বাচনের প্রায় দুই বছর (২৬ মাস) পর।

২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে সরকার কঠোর ও নিষ্ঠুরভাবে তা দমনের চেষ্টা করে। এর ফলে সেই আন্দোলন সরকারপতনের আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট লাখো মানুষ যখন গণভবনের দিকে আসা শুরু করে, তখন শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। জাতিসংঘের তথ্যমতে, জুলাই ও আগস্টের ওই কয়েক সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

তিন দিন পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সংস্কার, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর থেকে সরকার বারবার সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনকেই তাদের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিএনপি ও তাদের মিত্ররা শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্বাচন পেছানোর ইঙ্গিত দেওয়ায় তারা অসন্তুষ্ট ছিল। বিলম্বিত নির্বাচন নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ১৩ জুন লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ঘোষণা করেন, প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ২০২৬ সালের রমজানের আগের সপ্তাহে নির্বাচন হতে পারে।

তবে বহু কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কার্যক্রম অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অনেকটা অধরা ছিল। শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩০টি দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ২৫টি দল ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করে। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) পাঁচটি দল এতে সই করতে অস্বীকৃতি জানায়।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর সরকার ঘোষণা দেয় যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হবে। একই সঙ্গে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে সংসদে উচ্চকক্ষ চালুর কথাও জানানো হয়। এরপর ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন তফসিলে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে। প্রচারণায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থাকলেও অতীতের নির্বাচনের তুলনায় এবারের পরিবেশ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ।

আওয়ামী লীগের পতনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। দলটির নেতাদের দেশত্যাগ এবং অভ্যুত্থানকালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত করায় নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের হাতে থাকা আসনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে ক্ষমতায় এসে নিজেদের ঘাঁটিগুলো ধরে রেখেছিল। কিন্তু গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সেই ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল মূলত একতরফা। বিরোধী জোটের দলগুলো ওই দুই নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তির অভিযোগ ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। তিনি মনে করেন, বিএনপির প্রথাগত ঘাঁটির বাইরেও জেতার সুযোগ রয়েছে, তবে তা নির্ভর করবে তাদের কৌশল, প্রার্থী ও আচরণের ওপর। এ ক্ষেত্রে তরুণ ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারেন।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এবারই দলটি সবচেয়ে দীর্ঘ সময়—১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াত ১৯৭৬ সালে পুনর্গঠিত হয় এবং পরে ১৯৯৯ সালে বিএনপির সঙ্গে চার দলীয় জোটে যোগ দেয়। ২০০১ সালে তারা জয়ী হয় এবং জামায়াতের দুজন নেতা মন্ত্রী হন। তবে ২০০৮ সালে তারা পরাজিত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উভয় দলই নিপীড়নের শিকার হয়। ২০১২ সালে আরও কয়েকটি দল যোগ দিলে চার দলীয় জোট ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। পরের বছর হাইকোর্ট জামায়াতের গঠনতন্ত্র দেশের সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী হওয়ায় তাদের নিবন্ধন বাতিল করে।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিএনপি ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি তার মিত্রদের জোটের নাম ব্যবহার না করার অনুরোধ জানালে ২০ দলীয় জোট ভেঙে যায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন আরেকটি নির্বাচনের দোরগোড়ায় দেশ। এতগুলো নির্বাচনে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারি দল কখনোই পরাজিত হয়নি।

১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম নির্বাচনে জয়ের স্বাদ পায়। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৬, ২০০৮ এবং এর পরের টানা তিনটি নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তারা ক্ষমতায় আসে। এর মধ্যে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল বিরোধী দলহীন একতরফা। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ হিসেবে কলঙ্কিত। সমালোচকরা এই তিনটি নির্বাচনকেই ‘পাতানো’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনও ছিল অনেকটা একতরফা।

বিএনপি ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ২০০১ সালে জয়লাভ করে। এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনামলে জাতীয় পার্টি ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে পরপর দুবার জয়ী হয়—যার দুটিই ছিল একতরফা।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হয়েছে, তার প্রতিটিই অনুষ্ঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের চারটি নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনের সবগুলোতেই ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়েছে।

বাংলাদেশ পাঁচটি একতরফা নির্বাচনের (১৯৮৬, ১৯৮৮, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, ২০১৪ ও ২০২৪) সাক্ষী হয়েছে, যার প্রতিটিতেই বিরোধীরা বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগ পাঁচবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, বিএনপি এককভাবে দুবার ও মিত্রদের নিয়ে একবার এবং জাতীয় পার্টি একবার এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

সংসদীয় ব্যবস্থা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বাংলাদেশ ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপতিশাসিত এবং সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়।

এখন ভোটের জন্য অপেক্ষায় পুরো দেশ। প্রতিটি চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুম—সবখানেই এখন সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। এই অনিশ্চয়তাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।

Popular

More like this
Related

পুরান ঢাকায় জুতার কারখানায় আগুন

রাজধানীর পুরান ঢাকায় একটি জুতার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।আজ...

কারওয়ান বাজারের কাঠপট্টিতে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৫ ইউনিট

রাজধানীর বাজারের কাঠপট্টি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।আজ সোমবার রাত...

ফরিদপুরে শেখ মনিরুজ্জামান অভি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

ফরিদপুরে দুই দিনব্যাপী শেখ মনিরুজ্জামান অভি আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা...

দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার জামায়াত আমিরের

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে...