৯৮ মিনিটে গোলরক্ষকের গোল, রিয়ালকে হারিয়ে প্লে-অফে বেনফিকা

Date:

ফুটবলের মঞ্চে গোল দিয়ে নায়ক সাধারণত স্ট্রাইকার কিংবা মিডফিল্ডাররাই হয়ে থাকেন। কিন্তু বুধবার রাতে সেই চিরচেনা গল্প বদলে দিলেন এক গোলরক্ষক। ম্যাচের ৯৮তম মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে উঠে এসে হেডে গোল করে বেনফিকাকে নাটকীয়ভাবে নকআউট পর্বে তুলে দিলেন গোলরক্ষক আনাতোলি ত্রুবিন। এই এক গোলেই ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে তৈরি হলো এক বিরল ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। 

লিসবনের এস্তাদিও দা লুজে হোসে মরিনহোর বেনফিকা ৪-২ গোলে হারাল রিয়াল মাদ্রিদকে, আর এই হারের ফলে লিগ পর্বে নবম স্থানে থেকে শেষ করতে হলো স্প্যানিশ জায়ান্টদের, যার কারণে তাদের সরাসরি নকআউটে না গিয়ে খেলতে হবে দুই লেগের প্লে-অফে। বিপরীতে গোল ব্যবধানে শেষ মুহূর্তের সেই গোলেই বেনফিকা নিশ্চিত করল শেষ যোগ্যতা স্থান।

ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল তীব্র গতি ও চাপ। বেনফিকা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে এবং একের পর এক সুযোগ তৈরি করে রিয়াল রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে। জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের গতিময় আক্রমণে বারবার বিপদে পড়ে মাদ্রিদ।

১৫তম মিনিটে জুড বেলিংহামের চ্যালেঞ্জে প্রেস্তিয়ানি পড়ে গেলে রেফারি প্রথমে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিলেও ভিএআর হস্তক্ষেপে তা বাতিল হয়। কিছুক্ষণ পরেই প্রেস্তিয়ানির বাঁকানো শটে থিবো কোর্তোয়া দুর্দান্ত সেভ করে বল ক্রসবারে পাঠান। বৃষ্টিভেজা লিসবনে ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে রিয়াল, আর ৩০ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপে ব্যাক-পোস্ট হেডে গোল করে তাদের এগিয়ে দেন।

কিন্তু সেই লিড বেশিক্ষণ টেকেনি। মাত্র ছয় মিনিট পরেই দ্রুত কাউন্টার আক্রমণে রাউল আসেনসিওকে পিছনে ফেলে ভ্যাঙ্গেলিস পাভলিদিস বল বাড়ান, আর শেলদেরুপ হেডে জালে পাঠিয়ে ম্যাচে সমতা ফেরান। এরপর বেনফিকা একের পর এক আক্রমণে রিয়ালকে চাপে রাখে। স্টপেজ টাইমে কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির শার্ট টানার অপরাধে অরেলিয়েন চুয়ামেনির বিরুদ্ধে পেনাল্টি পায় বেনফিকা, আর পাভলিদিস সেটি অনায়াসে জালে পাঠিয়ে প্রথমার্ধ শেষে স্বাগতিকদের ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।

দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের গতি কমেনি। বলের দখল নেওয়ার চেষ্টা করলেও বেনফিকার কাউন্টার আক্রমণ ছিল ধারালো। ৫৪ মিনিটে আবারও শেলদেরুপ গোল করলে ব্যবধান বাড়ে বেনফিকার। তবে দ্রুতই ম্যাচে ফেরে রিয়াল। বদলি হিসেবে নামা রদ্রিগো ও আর্দা গুলারের সঙ্গে দারুণ সমন্বয়ে ৫৮ মিনিটে এমবাপে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন, স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-২। এরপর দুই দলই একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে, ম্যাচের ভাগ্য তখন পুরোপুরি ঝুলে থাকে ইউরোপের অন্যান্য মাঠের ফলাফলের ওপর।

শেষ দিকে নাটক আরও ঘনীভূত হয়। রিয়াল মাদ্রিদ দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড পাওয়ায় ৯ জনে নেমে যায়, তবুও বেনফিকার যোগ্যতা তখনও নিশ্চিত ছিল না। গোল ব্যবধান ও পয়েন্টের হিসাব অনুযায়ী তারা বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো স্টেডিয়ামে তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করা উত্তেজনা, দর্শকদের চোখ ইউরোপের অন্য ম্যাচের স্কোরবোর্ডে, আর মাঠে শেষ মুহূর্তের একটি সুযোগের অপেক্ষা।

ঠিক তখনই আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ৯৮তম মিনিটে বেনফিকা একটি ফ্রি-কিক পায়। শেষ আশার প্রতীক হয়ে নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে সামনে উঠে আসেন গোলরক্ষক আনাতোলি ত্রুবিন। বল আসে বক্সে, আর ঠিক তখনই নিখুঁত টাইমিংয়ে হেড করে জালে পাঠান তিনি। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে এস্তাদিও দা লুজ, গর্জে ওঠে হাজারো কণ্ঠ, আবেগে ভেসে যায় পুরো স্টেডিয়াম। এক গোলরক্ষকের এক হেডার বদলে দেয় পুরো একটি মৌসুমের ভাগ্য।

এই গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো ইউরোপীয় চিত্রনাট্য। বেনফিকা জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্বে, আর রিয়াল মাদ্রিদকে যেতে হচ্ছে অনিশ্চিত প্লে-অফের পথে। হোসে মরিনহোর জন্য এটি ছিল পুরোনো ক্লাবের বিপক্ষে প্রথম জয়, আর ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল এক অনন্য গল্প, যেখানে নায়ক কোনো স্ট্রাইকার নয়, কোনো মিডফিল্ডার নয়, নায়ক একজন গোলরক্ষক।

 

Popular

More like this
Related

বড়দিনে রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা বিনিময়

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব 'বড়দিন' উপলক্ষে দেশের...

মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এভারকেয়ারে তারেক রহমান

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এভারকেয়ার হাসপাতালে...

চরদখলে ৫ খুন: মামলায় আসামি ৩০, গ্রেপ্তার নেই কেউ

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় চর দখল নিয়ে গত মঙ্গলবার সংঘর্ষে...

যে যেভাবে পারছে সেভাবে চর দখলের চেষ্টা করছে: হাতিয়ার ইউএনও

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় চর দখল নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপক্ষের...