মাঠের লড়াই শুরু হতে তখনও মাস চারেক বাকি। ফুটবল উন্মাদনায় কাঁপছে টেমস নদীর দেশ ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের সেই বসন্তে ব্রিটিশদের গর্ব তখন আকাশচুম্বী, কারণ প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক তারা। কিন্তু ২০ মার্চের অভিশপ্ত বিকেলে পুরো ব্রিটেন যেন এক মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। ওয়েস্টমিনিস্টারের সেন্ট্রাল হল থেকে চুরি হয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু— জুলে রিমে ট্রফি!
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে ৩০ লাখ পাউন্ড মূল্যের দুর্লভ সব ডাকটিকিট উপেক্ষা করে চোর কেবল নিয়ে গেল সোনার প্রলেপ দেওয়া রূপার মূর্তিটি, যার ভিত্তি ছিল মূল্যবান নীলা পাথরের। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় শুরু হলো এক চরম বিব্রতকর অধ্যায়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা যখন অন্ধকারে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির এক চতুষ্পদ উদ্ধারকর্তা। তার নাম ‘পিকলস’। কালো-সাদা রঙের এক সাধারণ কলি জাতের কুকুর, যে রাতারাতি হয়ে উঠল বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত নায়ক।
ঘটনাটি ছিল রোববারের। সেন্ট্রাল হলে ‘স্পোর্ট উইথ স্ট্যাম্পস’ প্রদর্শনীতে কাঁচের বাক্সে রাখা ছিল জুলে রিমে ট্রফিটি। চোর এতটাই চতুর ছিল যে, চারদিকে রক্ষী থাকা সত্ত্বেও সবার নজর এড়িয়ে ট্রফিটি নিয়ে চম্পট দেয়। পরদিন ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) ও ক্লাব চেলসি এফসির চেয়ারম্যান জো মিয়ার্সের কাছে আসে একটি উড়ো ফোন। জনৈক ‘জ্যাকসন’ দাবি করে বসেন ১৫ হাজার পাউন্ড। প্রমাণ হিসেবে মিয়ার্সের কাছে পাঠানো হয় ট্রফির ওপরের অংশের আস্তরণটি, যা খুলে ফেলা যেত। এটি ছিল চোরের কাছে ট্রফিটি থাকার অকাট্য প্রমাণ।
এরপর পুলিশের ফাঁদে পড়ে গ্রেপ্তার হন এডওয়ার্ড বেচলি নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু ট্রফির হদিস মিলল না। বেচলি দাবি করেন, তিনি কেবলই একজন মধ্যস্বত্বভোগী এবং আসল চোর ‘দ্য পোল’ নামের অন্য কেউ। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাদের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। ট্রফি ছাড়া বিশ্বকাপ শুরু করা মানে বিশ্বজুড়ে স্রেফ হাসির পাত্র হওয়া। ঠিক সেই সময়েই দৃশ্যপটে আগমন ডেভিড কর্বেট ও তার প্রিয় কুকুর পিকলসের।
২৭ মার্চ, ১৯৬৬। দক্ষিণ লন্ডনের আপার নরউডের বাসিন্দা কর্বেট পেশায় ছিলেন একজন নৌচালক। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি। বিউলা হিল এলাকায় একটি পার্ক করা গাড়ির চাকার পাশে খবরের কাগজে মোড়ানো একটি প্যাকেট দেখে থমকে দাঁড়ায় চার বছর বয়সী পিকলস।
কর্বেট প্রথমে ভেবেছিলেন, ওটা হয়তো কোনো বোমা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) তৎপরতার কারণে তখন লন্ডনে বোমাতঙ্ক ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ভয়ে ভয়ে কাগজ সরাতেই কর্বেটের চোখ ছানাবড়া! ভেতরে উঁকি দিচ্ছে এক সোনালি নারীমূর্তি। নিচে লেখা— ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি এবং আরও নাম। কর্বেট বুঝতে পারেন, এটিই সেই চুরি হওয়া বিশ্বসেরার মুকুট। দৌড়ে বাড়ি ফিরে তিনি স্ত্রীকে সবকিছু খুলে বলেন। তবে তার মনে কিছুটা সংশয়ও ছিল, ‘এটা দেখতে ঠিক বিশ্বকাপের মতো লাগছিল না, কারণ খুব ছোট আকারের ছিল।’
তবে নায়ক হওয়ার পথটা অত সহজ ছিল না। জিপসি হিল থানায় ট্রফি জমা দিতে গিয়ে উল্টো নিজেই ফেঁসে যাচ্ছিলেন কর্বেট। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের জাঁদরেল গোয়েন্দারা তাকেই মূল সন্দেহভাজন মনে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়। পিকলস পায় ‘জাতীয় বীর’-এর মর্যাদা।
ট্রফি উদ্ধারের পর পিকলসের জীবন বদলে যায় রূপকথার মতো। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সেবার যখন বিশ্বকাপ জিতল, বিজয় উৎসবে ফুটবলারদের পাশাপাশি ডাক পায় এই কুকুরটিও। এর মালিক কর্বেট পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন প্রায় ৬ হাজার পাউন্ড, যা দিয়ে তিনি লিংফিল্ডে একটি বাড়ি কেনেন।
পিকলসের খ্যাতি তখন তুঙ্গে। তাকে নিয়ে তৈরি হয় সিনেমা ‘দ্য স্পাই উইথ দ্য কোল্ড নোজ’। ওই সময়ের জনপ্রিয় টিভি শো ‘ব্লু পিটার’সহ বেশ কিছু অনুষ্ঠানে সে ছিল অতিথি। এমনকি একটি নামী পেট ফুড কোম্পানি তাকে আজীবন বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ব্রিটিশ সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তখন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে নিত পিকলস।
তবে জুলে রিমে ট্রফিটি যেন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এক অদ্ভুত অভিশাপ। ট্রফি উদ্ধারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান এফএ চেয়ারম্যান মিয়ার্স। দুই বছরের সাজা শেষে বেচলি জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ফুসফুসের রোগে মারা যান। আর সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল পিকলসের মৃত্যু।
১৯৬৭ সালে কর্বেটের নতুন বাড়ির বাগানে একটি বিড়ালকে তাড়া করতে গিয়ে গাছের ডালে নিজের গলার চেইন আটকে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায় ফুটবলের এই অকৃত্রিম বন্ধু। তার অকাল মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে পড়েছিল গোটা ব্রিটেন। কর্বেট তার বাড়ির পেছনের বাগানেই সমাহিত করেন পিকলসকে। আজও ম্যানচেস্টারের জাতীয় ফুটবল জাদুঘরে গেলে দেখা যায় পিকলসের গলার সেই কলারটি।
পিকলস নেই, কিন্তু তার গল্প বেঁচে আছে দশকের পর দশক ধরে। ২০০৬ সালে আইটিভি নির্মাণ করে ‘পিকলস: দ্য ডগ হু ওন দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’। নাটকটি মূলত ট্রফি চুরির রহস্য এবং পিকলসের বীরত্বগাথাকে কেন্দ্র করেই তৈরি করা হয়। এমনকি জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘রিভার্স: ১৯৯৯’-এ পিকলসকে দেখা যায় একটি ‘প্লেয়েবল ক্যারেক্টার’ হিসেবে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ লন্ডনের বিউলা হিলে একটি স্মারক ফলক উন্মোচন করা হয়, যেখানে আজও ফুটবলপ্রেমীরা ভিড় করেন তাদের চতুষ্পদ নায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, যে ট্রফিটি পিকলস উদ্ধার করেছিল, তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে সেটি ১৯৭০ সালে ব্রাজিল চিরতরে নিজেদের করে নেওয়ার পর ১৯৮৩ সালে আবারও চুরি হয়। রিও দি জেনেইরোর সেই চুরির পর ট্রফিটি আর কখনোই উদ্ধার করা যায়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা সেটি গলিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে ম্যানচেস্টারের জাদুঘরে শোভা পাওয়া জুলে রিমে ট্রফিটি এফএর তৈরি করা একটি ধাতব রেপ্লিকা, যা ১৯৯৭ সালে ফিফা নিলামে কিনে নিয়েছিল। প্রথমবার চুরির ঘটনার পরপরই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এটি বানানো হয়েছিল।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় এসেছেন, কিন্তু মাঠের বাইরে থেকে একটি কুকুর যেভাবে ফুটবলীয় রোমাঞ্চের অংশ হয়ে আছে, তা সত্যিই অনন্য।