শৃঙ্খলাই হোক নতুন বাংলাদেশের পরিচয়

Date:

ইউরোপের প্রধানমন্ত্রী সাইকেলে করে অফিসে যান—এমন গল্প আমরা অনেকবার শুনেছি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খান—এ কথাও। অনেকের কাছেই এসব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে কোপেনহেগেনে ডেনিশ পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজ চোখে এমন দৃশ্য দেখেছি। তখনকার প্রধানমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সাইকেলে করে এসেছিলেন। তার ছবি তোলার সুযোগও হয়েছিল।

ঢাকায় কি এমনটা সম্ভব? আমাদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর চললে পথচারীদের থামিয়ে দেওয়া হয়, পুরো সড়ক ফাঁকা করে দেওয়া হয়, শহর থমকে দাঁড়ায়। প্রতিদিন যানজটে ভোগা নগরবাসীর কাছে এটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিন্ন একটি বার্তা দিয়েছেন। ১৭ বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। তার গাড়ি ট্রাফিক সিগনালে লাল বাতি জ্বললে থামে—এ দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি প্রশংসিত হয়েছে। তবে মানুষের কৌতূহলও আছে—এই ধারা কি নিয়মে পরিণত হবে, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে? একইসঙ্গে নিরাপত্তা যেন যথাযথ থাকে—এ দাবিও আছে।

শুধু সড়কে নয়, সচিবালয়েও তিনি শৃঙ্খলার বার্তা দিয়েছেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি সময়মতো অফিসে যাচ্ছেন এবং মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা অফিস সময় মেনে চলছেন কি না, তা দেখছেন। ছুটির দিনেও কাজ করেছেন, দেরিতে আসার সংস্কৃতি মেনে নেওয়া হবে না—এ কথা পরিষ্কার করেছেন। উপস্থিতি খাতা পর্যালোচনা করে সময়ের পরও কাজ করা কয়েকজনকে ধন্যবাদ দিয়েছেন, আবার যারা নিয়ম মানেননি, তাদের প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয়ও নির্দেশ দিয়েছে—নিয়মিত উপস্থিতি, সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব ছোট উদ্যোগ মনে হলেও এর তাৎপর্য বড়। শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সময় মেনে চলে, তাহলে সেটি পুরো প্রশাসনে একটি বার্তা দেয়। আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উন্নত করতে এটি জরুরি। ঢাকার যানজট ও সময় না মানার সংস্কৃতি ইতোমধ্যে আমাদের জন্য অস্বস্তিকর পরিচয় তৈরি করেছে। আমরা দেরি করি, তারপর দায় দিই যানজটকে।

বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপে প্রায়ই শুনেছি—ঢাকার ট্রাফিক তাদের বিস্মিত করে। অনেকেই রসিকতার ছলে বলেন, এখানে সময় যেন ভিন্নভাবে চলে। বিনিয়োগের প্রসঙ্গে তারা দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা তোলেন। তবে বাঙালির আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার প্রশংসাও করেন। কিন্তু শুধু ভালো মানুষ হলেই হবে না—দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।

এটি সরাসরি উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার যানজটে বছরে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। উৎপাদনশীলতা কমে, জ্বালানি অপচয় হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। প্রতিদিন লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকেন—যে সময়টুকু কাজে লাগানো যেত। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করা এক তরুণ সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, ঢাকার যানজটের হতাশাই তাকে দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে।

আগের সরকার মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। সেগুলো কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল। বর্তমান সরকারের সামনে বড় ঋণভার রয়েছে—তাই হয়তো একই ধরনের প্রকল্পে তারা সতর্ক থাকবে। কিন্তু কম ব্যয়ে করা যায় এমন উদ্যোগ—যেমন পর্যাপ্ত ডাবল-ডেকার বাস, বৃত্তাকার সড়ক ও নৌপথ চালু, আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল—এসবও তো বছর বছর ঝুলে আছে।

আমাদের আরেক বড় সমস্যা—প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়া। কাজের দেরিতে ব্যয় বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। কারণ বিশ্ব এখন প্রতিযোগিতার জায়গা। দক্ষতা ও সক্ষমতা ছাড়া কেউ কাউকে গুরুত্ব দেয় না।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল—বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য—এসব মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাস্তায় বিশৃঙ্খলা ও মব সহিংসতার ঘটনাও হতাশা তৈরি করে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। এখন মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব চায়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। অর্থনীতি সামাল দেওয়া এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা—এই দুটি হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের শক্তি আছে—উর্বর ভূমি, জলসম্পদ, কৌশলগত অবস্থান, ১৭ কোটি মানুষ। দুর্বলতা আছে—অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলার ঘাটতি। সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসবই সাফল্যের শর্ত।

প্রধানমন্ত্রী শৃঙ্খলার যে বার্তা দিয়েছেন, সেটি যদি সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হয়, তবে সেটিই হতে পারে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি। ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’—শুধু স্লোগান নয়, এটি হতে হবে বাস্তব কাজের প্রতিফলন। পরিকল্পনা জনগণকে জানাতে হবে, তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাফল্যের চাবিকাঠি শৃঙ্খলা—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রাজপথ পর্যন্ত। কারণ মানুষ দেখছে। তরুণ প্রজন্ম আরও গভীরভাবে দেখছে। এখন মানুষ আরও সচেতন, আরও সংযুক্ত, আরও প্রত্যাশাপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে, তথ্য লুকানো কঠিন। শাসনের ধরনও বদলাতে হবে।

লেখক: দ্য ডেইলি স্টারের কূটনৈতিক প্রতিবেদক। যোগাযোগ: [email protected]

Popular

More like this
Related

কক্সবাজারে গ্যাসে স্টেশনে লিকেজ, বিস্ফোরণে আহত ১৫, এলাকায় সতর্কতা

কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলীতে নবনির্মিত গ্যাস ফিলিং স্টেশনে বিস্ফোরণ ও...

যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় কী কৌশল নিচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, দীর্ঘকাল ধরে...

দেশে ভূমিকম্প অনুভূত

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।আজ বুধবার রাত...

ডিসেম্বরে পুনঃতফসিল হয় গভর্নর মোস্তাকুরের প্রতিষ্ঠানের ৮৯ কোটি টাকার ঋণ

গত ডিসেম্বরেই মো. মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান 'হেরা...