শরীয়তপুরের নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বাস করা অন্তত পাঁচ থেকে ছয় হাজার বানর তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে। খাবারের অভাবে দল বেঁধে বসতবাড়িতে হানা দিচ্ছে বানরগুলো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা বেশি থাকায় প্রায় ৫০ বছর ধরে এ এলাকায় বানরগুলোর বসবাস। নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিংগামানিক কার্তিকপুরের পালপাড়া, মধুপুর ও পাচালিয়া গ্রাম এলাকায় সবচেয়ে বেশি বানরের দেখা মেলে।
তবে বর্তমানে এলাকায় বনজ গাছের সংখ্যা বেশি হলেও ফলদ গাছ তুলনামূলক কম। ফলে পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে বানরগুলো গ্রামের বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। অনেক সময় বাড়ির উঠানে শুকাতে দেওয়া, রান্নাঘরে রাখা কিংবা শিশুদের হাতে থাকা খাবারও কেড়ে নিচ্ছে তারা। এতে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বানরগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ফলদ গাছ রোপণ ও সরকারিভাবে নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করা হলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। এতে একদিকে যেমন বানরগুলো খাদ্যের অভাবে কষ্ট পাবে না, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে সংঘাতও কমবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শিগগিরই একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বানরগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
অবশ্য বনবিভাগের ভাষ্য, শরীয়তপুরের ওই এলাকায় বানরের বসবাসের বিষয়টি তাদের বিশেষভাবে জানা নেই।
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন গাছপালার মধ্যে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বানরগুলো। সুযোগ পেলেই আশপাশের বসতবাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে তারা। খাবারের খোঁজে বসতবাড়ির ঘরে, টিনের চালায়, গাছপালা, বাঁশ-ঝাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক সময় তাদেরকে মানুষের দেওয়া কলা মুড়ি খেতেও দেখা গেছে। পাশাপাশি হোটেলের ফেলে দেওয়া খাদ্যের দিকেও নজর থাকে বানরগুলোর।
এই এলাকার বিষ্ণুপদ বালার স্ত্রী অঞ্জু বালা (৩৫) বলেন, ‘আমরা বানরের অত্যাচার মেনে নিয়েছি। এছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। এরা আমাদের বাড়িতে ঢুকে খাবার চুরি করে নিয়ে যায়। খাবার নষ্ট করে ফেলে। ঘরে ঢুকে পায়খানা-প্রস্রাব করে। আমরা শিশুদের হাতে কোনো খাবার দিতে পারি না। শিশুরা খাবার নিয়ে বাইরে গেলেই আক্রমণ করে। তবুও আমরা কখনো তাদেরকে মারধর করি না। বেশি জ্বালাতন করলে মাঝে মাঝে তাড়িয়ে দেই। কারণ আমাদের মতো তাদেরও ক্ষুধার জ্বালা রয়েছে।’
এই এলাকার বাসিন্দা মিন্টু পাল (৪৫) বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমরা বানরের সাথে খেলাধুলা করি। তাদের সাথেই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমাদের সন্তানরাও তেমন তাদের সাথে খেলাধুলা করে। পাশাপাশি বানরকে আমরা কলা, মুড়ি, টোস্ট, বিস্কুটসহ নানা ধরনের খাবার দিয়ে থাকি। আমাদের এখানে পাশাপাশি গ্রামগুলো মিলিয়ে অন্তত ৫ হাজারের বেশি বানর হবে।’
‘কিন্তু একটা দুঃখের বিষয়, আনুমানিক ৫০ বছর ধরে বানরগুলো এলাকায় থাকছে। প্রশাসন থেকে কেউ এখন পর্যন্ত খবর নেয়নি। যদি সরকারিভাবে বানরের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। তাহলে হয়তো এদের ক্ষুধার জ্বালা কিছুটা মিটত। আমরা খাবার দেওয়ার পরেও অনেক সময় বানরগুলো বাসা-বাড়িতে গিয়ে খাবারের জন্য হানা দেয়।’
যোগাযোগ করা হলে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মূলত বানরদের আবাসস্থলে জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্য সংকটের কারণে বানরগুলো অনেক সময় জনসাধারণের বাসা-বাড়িতে হানা দেয়। মাঝে মাঝে অনেক সময় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগেও বানরদেরকে খাবার দিয়ে থাকে। ইতোমধ্যে আমরা এই বিষয়ে অবগত হয়েছি। বানরগুলো যেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট না পায়, সেজন্য আমরা তাদের জন্য প্রকল্প হাতে নেব। প্রয়োজনে বানরের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরির জন্য কোনো খাস জমিতে বনায়ন তৈরির মাধ্যমে তাদেরকে সেখানে পুনর্বাসন করব।’
এ বিষয়ে জেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. রহমান বলেন, ‘আমরা শুনেছি শরীয়তপুরের দুইটি উপজেলায় বানরের অবস্থান রয়েছে। তবে ওই এলাকায় বানরের বিষয়ে বিস্তারিত জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। পরবর্তীতে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করব।’