লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনে আঘাত করতে পারবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র?

Date:

হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছিলেন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই বৈঠকে দেশটির যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান যে, ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডনেও এসে পড়তে পারে।

গত ২৬ মার্চ সেই বৈঠক ডাকা হয়েছিল। সেদিন সেখানে গত ২০ মার্চের এক ঘটনার উদাহরণও টানা হয়।

তেহরান এখন বৈশ্বিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে, বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী।

 

হোয়াইট হাউসে সেই বৈঠকে নিজের বক্তব্যে যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথ আরও জানান, সম্প্রতি দিয়েগো গার্সিয়ায় ব্রিটিশ-মার্কিন যৌথ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়—আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যবর্তী ভারত মহাসাগরে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়া। দেখতে অনেকটা ‘সুইমিং পুলের’ মতো। গত ২০ মার্চ সেখানে ব্রিটিশ ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

সেগুলোর একটি মাঝপথে ভেঙে পড়ে, অন্যটিকে আকাশে ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেই সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়।

 

দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে, উল্লেখ করে গত ২৭ মার্চ ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ব্রিটিশ সরকার নিশ্চিত করে বলেছে যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনগুলোয় মন্তব্য করা হয়, এই ঘটনার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের জন্যেও এখন ইরান একটি হুমকি হয়ে গেল।  

এর আগে, লন্ডনে আঘাত করার ক্ষমতা তেহরানের আছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি অস্বীকার করেছিলেন। তবে বলেন, কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে ইরানের দিক থেকে এখনই কোনো হুমকি নেই।

 

 

গত ২৪ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার এবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরান জানিয়ে দিলো ইউরোপ তাদের হাতের নাগালে’।

এতে আরও বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বহু দূর যেতে পারে তা সুদূর দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ইঙ্গ-মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দিয়েগো গার্সিয়া বিমানঘাঁটি ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়।

ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠিক কতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত নয়। কেননা, একটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ভেঙে পড়ে এবং অন্যটিকে ধ্বংস করা হয়।

 

কিন্তু, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ‘এবারই প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এত দূর পৌঁছালো’।

এর আগ পর্যন্ত কেউই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে এমনটি ভাবতেও পারেননি। কেননা, ইরানের শাসকরা বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাল্লা নিজেরাই ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত রেখেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে বলেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার বিষয়ে তাদের জোটের পক্ষ থেকে কিছুই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

 

এর পরপরই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমায়েলি বাঘাই তার দেশের পক্ষ থেকে কোনো বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে যে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তেহরান ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার জন্য ‘বিশাল হুমকি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ব্রিটিশ সরকার এমন দাবি খারিজ করে দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ব্রিটেন ঝুঁকিতে আছে কি না সে বিষয়ে কোনো যথাযথ মূল্যায়ন নেই।’

এক গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, তেহরান থেকে দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার হলে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের দূরত্ব ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দূরত্ব ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার ও যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের দূরত্ব ৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।

সেই হিসাবে ইউরোপের অনেক দেশের রাজধানী যে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় তা অনেকটাই নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

 

গত ২৩ মার্চ বিবিসির এক প্রতিবেদনে তেহরান থেকে দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব ৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার বলে জানানো হয়। লন্ডন কি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধির মধ্যে—এমন প্রশ্ন রেখে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ইরান যদি ইউরোপকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে তাহলে ইতোমধ্যে সেই মহাদেশের কয়েকটি দেশ সেই পরিসীমায় পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার বিপদ নিয়ে ক্যাপিটল হিল বহু বছর ধরে উদ্বিগ্ন, জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

চলমান যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে মার্কিন নৌবাহিনী একই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়।

 

বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, ব্রিটিশ সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স রিভিউয়ে জানানো হয়েছে দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুব জোরালো নয়।

এতে আরও বলা হয়, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে মনে হয়—যুক্তরাজ্যের জন্য ইরান এখনই তেমন কোনো হুমকি নয়।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) জ্যেষ্ঠ ফেলো সিদ্ধার্থ কাউশাল বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানের মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কথা চলমান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই জানা যাচ্ছিল।’ তবে তিনি মনে করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ‘লন্ডন পর্যন্ত’ পৌঁছাতে পারে।

তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি অনেকটা রাবারের মতো। যদি বোমার ওজন কমিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি বেড়ে যায়।

ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে না বলেও জানান তিনি।

তত্ত্বগতভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডনে পৌঁছাতে পারে, উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন—কিন্তু, তাতে কী আসে যায়?

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এএনএ করপোরেশনের গবেষক ডেকার এভিলেথ এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করে বিবিসিকে বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশায় অনেক অজানা কিছু থাকতে পারে।’

‘বাস্তবতা হচ্ছে, লন্ডনে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে পারে। তবে এ কথাও বলবো যে, লন্ডন পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানোর ঝুঁকি খুবই কম,’ মন্তব্য এই গবেষকের।

গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান সিবিললাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জাস্টিন ক্রাম্প বিবিসিকে বলেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে চমক দিতে সক্ষম ইরান।’ ইরানি বাহিনীর ক্ষমতা অনেক কমে গেছে বলেও মনে করেন তিনি।

 

যুক্তরাজ্যের আবাসন ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী স্টিভ রিড স্কাই নিউজকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিবেচনায় নিলে যুক্তরাজ্য এখনো পর্যন্ত নিরাপদ। আগামীতেও নিরাপদ থাকবে।’

বিশ্লেষকদেরও অনেকের বিশ্বাস ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র লন্ডন পর্যন্ত আসতে অনেকগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে হবে। কেননা, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত।

 

 

গত ২৪ মার্চের এবিসি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ইরানের হাতে ১৪ ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে।

এগুলোর মধ্যে অন্তত দুটির, অর্থাৎ খুররমশহর ও সেজ্জিলের পরিধি প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার।

এর আগের দিন প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনটিতে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের বরাত দিয়ে বলা হয়—ইরানের ‘ফতেহ’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি ৫০০ কিলোমিটার, ‘জুলফিকারের’ পরিধি ৭০০ কিলোমিটার, ‘কিয়ামের’ পরিধি ৭৫০ কিলোমিটার ও ‘শাহাব-৩’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি ২ হাজার কিলোমিটার।

 

ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আসলেই কতটুকু?—এমন প্রশ্ন রেখে এর জবাবে বিবিসির প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটি সফল না হলেও তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাউকে কোনো স্বচ্ছ ধারণা দিচ্ছে না।

এক সময় তেহরান বলেছিল যে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে। কিন্তু, ইসরায়েলের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে।

তারপরও অনেকের ধারণা ছিল যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারবে।

 

তবে ইরানের মধ্যম-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা সে বিষয়েও কারো পরিষ্কার ধারণা নেই।

রুসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিদ্ধার্থ কাউশালের মতে, ইরানের দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দরকার হতে পারে যদি দেশটি পরমাণু বোমা তৈরি করে। তেহরানের শাসকরা পরমাণু বোমা না বানানোর রাষ্ট্রীয় নীতির কথা ক্রমাগত বলছে। অন্যদিকে, ইরান পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টা করছে বলে ক্রমাগত অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা।

আরেকটি কারণে, তথা মহাকাশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে থাকতে পারে।

তবে লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনসহ ইউরোপের বড় বড় শহরগুলো ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ঠিক কতটা শঙ্কিত তা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ উদ্যোগের মাধ্যমে হয়ত বোঝা যাবে।

Popular

More like this
Related

ইরানে হামলায় জড়িত মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করল স্পেন

ইরানের ওপর হামলায় জড়িত মার্কিন সামরিক বিমানগুলোর জন্য নিজেদের...

‘আমার ছেলে সাক্ষাৎ মরণ দেখে ফিরছে’

দুবাই থেকে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ১৮...

কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হবেন না: খেলোয়াড়দের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেলোয়াড়দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আপনারা...

একাত্তরের দায় ও জামায়াতের ‘ক্ষমা’ চাওয়ার রাজনীতি

ইতিহাসের ভয়াবহ অপরাধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র বা নেতৃত্ব কীভাবে...