বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ির পাহাড়ঘেরা ছোট্ট জনপদ শুকনাছড়িপাড়া। টিলার ওপর বাঁশের খুঁটির মাচাং ঘর, পাশে কাঠের তৈরি বৌদ্ধবিহার, মাঝখানে একটি পুরোনো তেঁতুল গাছ। গাছের নিচে বসানো পানির পাইপ থেকে টুপটাপ করে পড়ছে পানি। এই পানি শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না, এটি একটি পাড়ার আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক।
সরকারি সহায়তা না পেলেও নিজেদের একতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার ৩৫টি পরিবার গড়ে তুলেছে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ পানির পাইপলাইন, প্রায় আড়াই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং পরিবারভিত্তিক চাঁদায় পরিচালিত একটি বিদ্যালয়।
‘কেউ এনে দেয়নি, আমরাই এনেছি’
পাইপ থেকে কলসিতে পানি ভরছিলেন ৬১ বছর বয়সী বিনতি বালা তঞ্চঙ্গ্যা। মুখে তৃপ্তির হাসি।
‘পাঁচ বছর আগেও এখানে পানির জন্য হাহাকার ছিল। আধা কিলোমিটার নিচে ঝরনায় যেতে হতো। দিনে দুই-তিন ঘণ্টা শুধু পানি আনতেই চলে যেত। কেউ এনে দেয়নি, আমরা নিজেরাই পাইপলাইন বসিয়ে পানি এনেছি,’ বলেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাড়াটি এখন দুই কিলোমিটার দূরের হাজাছড়া ঝরনা থেকে জিএফএস পাইপের মাধ্যমে পানি পাচ্ছে। দুটি স্থানে ও বৌদ্ধবিহারে বসানো হয়েছে ট্যাংক। সেখান থেকেই পানি সংগ্রহ করেন বাসিন্দারা।
কান্দরি তঞ্চঙ্গ্যা ও চঞ্চনা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘পাহাড় বেয়ে পানি আনতে আনতে সব শক্তি শেষ হয়ে যেত। সপ্তাহের সব দিন গোসল করাও সম্ভব হতো না।’
৮৭ বছর বয়সী তিবাধন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রায় ৪৫ বছর আগে পাড়াটি গড়ে ওঠার পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ছিল।
‘আগে বন বেশি ছিল, এখন কমে গেছে। তাই ঝরনাতেও তেমন পানি নেই,’ বলেন তিনি।
আশ্বাসের পর আশ্বাস, কাজ হয়নি
স্থানীয়দের দাবি, একসময় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রকৌশলীরা এসে পরিদর্শনও করেন। কিন্তু কাজ আর এগোয়নি।
অবশেষে পাড়াবাসী নিজেরাই উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে শ্রম দিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মাটি কেটে পাইপ বসানো হয়। ঝরনা থেকে পানি এনে পাড়ার উঠানে ট্যাংক স্থাপন করা হয়। এখন কোথাও পাইপ নষ্ট হলে পালাক্রমে নিজেরাই তা মেরামত করেন।
পাড়ার কারবারি (পাড়া প্রধান) নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘উপজেলা, ইউনিয়ন, জেলা পরিষদের দরজায় বহু বছর ঘুরেছি। শুধু আশ্বাস পেয়েছি। শেষে সিদ্ধান্ত নিই, নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করব।’
অর্থের জোগান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরে বৌদ্ধবিহারের জন্য সংরক্ষিত জমিতে কলাবাগান করা হয়। পাশাপাশি পূর্ব পাশে ২০ একর প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত পাড়াবন থেকে বাঁশ বিক্রি করা হয়। কলা ও বাঁশ বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকা ওঠে। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকায় পাইপ ও সরঞ্জাম কেনা হয়। বাকি অর্থে বৌদ্ধবিহারের জন্য একটি আধাপাকা ভোজনশালা নির্মাণ করা হয়, যেটি এখন শিশুদের বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিজেদের বানানো রাস্তা, নিজেদের স্কুল
পানির পাশাপাশি গ্রামবাসী প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক নির্মাণ করেছেন, যা রোয়াংছড়ির প্রধান সড়কের সঙ্গে পাড়াকে যুক্ত করেছে। বর্ষায় কাদা হলেও শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেল ও ছোট যান চলাচল করতে পারে।
পাড়ার এক পাশে বাঁশের বেড়ার একটি ঘর, এটাই প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে ছাউনি না থাকায় আপাতত বৌদ্ধবিহারের ঘরেই পাঠদান চলছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি রঞ্জিত তঞ্চঙ্গ্যা জানান, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবার মাসে ৫০০ টাকা করে দেয়। যাদের ঘরে শিক্ষার্থী নেই, তারা ১০০ টাকা করে সহায়তা করেন।
‘এই টাকাতেই বিদ্যালয়ের খরচ চলে। ঢেউটিন কেনার মতো অর্থ নেই,’ বলেন তিনি।
‘স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার চেষ্টা’
রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লা অং মারমা বলেন, ‘তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষ খুবই পরিশ্রমী ও ঐক্যবদ্ধ। তারা সরকার থেকে কিছু পাওয়ার আশায় বসে থাকেন না।’
অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলী তুহীন বিশ্বাস বলেন, ‘তারা আবেদন করলে স্থাপিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে সহযোগিতা করা হবে।’
পাহাড়ের ঐতিহ্য, টিকে থাকার লড়াই
নীলবরণ তঞ্চঙ্গ্যার ভাষায়, ‘আগে পাহাড়ের পাড়াগুলো কোনো কিছুর জন্য কারও ওপর নির্ভর করত না। সেই ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি।’
সরকারি অবকাঠামোর ছোঁয়া না পেলেও ঐক্য, শ্রম ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুকনাছড়িপাড়া আজ স্বনির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। পাহাড়ি ঝরনার পানি এখন আর শুধু প্রয়োজন মেটায় না, এটি হয়ে উঠেছে একটি পাড়ার আত্মমর্যাদা, সাম্য ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক।