মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই নীতিগতভাবে আলোচনায় বসতে আগ্রহী হলেও বাস্তবে অবিশ্বাস ও অবস্থানের দূরত্ব বড় বাধা হয়ে আছে বলে মনে করছে পাকিস্তান। একইসঙ্গে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগে চাপ বাড়িয়েছে।
আজ রোববার ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে এসব তথ্য।
এতে বলা হয়, ইসলামাবাদ নিজেকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চায়। একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ—এই ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়েই তারা আলোচনার মঞ্চ তৈরি করেছে।
পাকিস্তান সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো পক্ষ নয় এবং সেখানে মার্কিন ঘাঁটিও নেই, ফলে অন্য সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীদের মতো বাড়তি রাজনৈতিক বোঝা তাদের নেই বলে জানায় দ্য গার্ডিয়ান।
তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে ইসরায়েলের ভূমিকা। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল ‘স্পয়লার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
শুক্রবার ইরানের দুটি বড় স্টিল কারখানা ও বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। পরদিন ইরানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা হয়েছে।
বেসামরিক স্থাপনায় এসব হামলাকে ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আলোচনার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
পাকিস্তানি কূটনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মালিহা লোধির মতে, সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখা।
তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ট্রাম্পকে বিশ্বাস করাই সবচেয়ে কঠিন। তিনি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান আলোচনায় আগ্রহী। কিন্তু তেহরান বলছে, ওয়াশিংটন একতরফাভাবে অবস্থান নিচ্ছে। ইরান শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তাও চায়।
হরমুজ প্রণালি নিয়েও নতুন প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। তেহরান গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। যদিও ট্রাম্প যৌথভাবে প্রণালি পরিচালনার ধারণা দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করে চলেছে। ইসলামাবাদের ধারণা, যদি দুই পক্ষ সত্যিই সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে এই দূরত্ব কমানো সম্ভব।
তবে আলোচনা সরাসরি নয়, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলাদা কক্ষে থাকা মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন। তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বসতে রাজি নয়।
বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য পাকিস্তান ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে অন্তর্ভূক্ত করা। ইরান এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে, কারণ তারা আগের মধ্যস্থতাকারীদের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে ইসলামাবাদ। এখন পরিস্থিতি জটিল হলে তাদের রিয়াদের পক্ষে যুদ্ধে জড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও বৃহৎ শিয়া জনগোষ্ঠী থাকার কারণে পাকিস্তান এ ধরনের সংঘাতে জড়াতে একেবারেই আগ্রহী নয়।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, সব মিলিয়ে যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলা এখন এক সূক্ষ্ম দড়ির ওপর হাঁটার মতো—যেখানে সামান্য বিচ্যুতিও পুরো প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে।