যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ

Date:

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীরা তার ‘স্বৈরাচারী’ শাসনব্যবস্থা, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট মফস্বলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের তিন হাজার ৩০০টিরও বেশি কর্মসূচিতে অন্তত ৮০ লাখ মানুষ অংশ নেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাতীয়ভাবে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব দেওয়া হয়নি।

এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল তৃতীয় ঘটনা যেখানে মার্কিনীরা ‘নো কিংস’ নামে একটি তৃণমূল আন্দোলনের ডাকে রাজপথে নামেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বিরোধিতার সবচেয়ে সোচ্চার ও প্রত্যক্ষ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আন্দোলন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনবহুল শহর নিউইয়র্কে কয়েক হাজার মানুষের প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হন অস্কারজয়ী অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য এক ‘অস্তিত্বের হুমকি’ বলে আখ্যা দেন।

বিক্ষোভের ঢেউ আটলান্টা থেকে সান ডিয়েগো পর্যন্ত আছড়ে পড়ে। দিনের শেষভাগে আলাস্কার বাসিন্দারাও এই প্রতিবাদে শামিল হন।

আটলান্টার সমাবেশে যোগ দেওয়া ৩৬ বছর বয়সী সাবেক সেনাসদস্য মার্ক ম্যাককাহি এএফপিকে বলেন, ‘জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো দেশ চলতে পারে না।’ সেখানেও কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখানে রাস্তায় নেমেছি, কারণ আমাদের মনে হচ্ছে সংবিধান নানাভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি এখন আর স্বাভাবিক নেই; যা ঘটছে তা মোটেও মেনে নেওয়ার মতো নয়।

ডেট্রয়েটের কাছাকাছি মিশিগানের ওয়েস্ট ব্লুমফিল্ড শহরে হিমাঙ্কের নিচের তীব্র শীত উপেক্ষা করেই প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নামে সাধারণ মানুষ।

এদিকে মার্কিন রাজধানী ওয়াশিংটনেও হাজার হাজার মানুষ পদযাত্রা করেন। তাদের অনেকের হাতে থাকা ব্যানারে বড় করে লেখা ছিল— ‘ট্রাম্পকে এখনই ক্ষমতা ছাড়তে হবে!’; ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো’। বিক্ষোভকারীরা রাজধানীর ন্যাশনাল মল এলাকায় জড়ো হয়ে সমাবেশ করেন।

৬৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত রবার্ট পাভোসেভিচ এএফপিকে বলেন, তিনি শুধু একের পর এক মিথ্যা বলেই যাচ্ছেন, অথচ কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না। আমরা এখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি।

সাপ্তাহিক ছুটির এই দিনে ট্রাম্প ছিলেন ফ্লোরিডায়।

ট্রাম্পবিরোধী এই গণজোয়ার মার্কিন সীমান্ত ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও আছড়ে পড়েছে। শনিবার ইউরোপের আমস্টারডাম, মাদ্রিদ ও রোমসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। ইতালির রোমে কড়া পুলিশি পাহারার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেন।

আমাদের আরও গভীরভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে

গত বছরের জুনে ট্রাম্পের ৭৯তম জন্মদিনে প্রথমবারের মতো দেশজুড়ে ‘নো কিংস’ প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। ওই দিনটি ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের আয়োজিত একটি সামরিক কুচকাওয়াজের সাথে মিলে গিয়েছিল। নিউইয়র্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকো পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মানুষ সেই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন।

আয়োজকদের মতে, অক্টোবরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রতিবাদে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নেন। তারা জানান, শনিবারের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও ১০ লাখ বেড়েছে এবং বিক্ষোভের সংখ্যাও আগের চেয়ে বেড়েছে ৬০০টিরও বেশি।

‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ আন্দোলনের অনুসারীরা ট্রাম্পকে যেমন ভক্তি করেন, ঠিক তেমনি আমেরিকার বিশাল রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্য প্রান্তের মানুষ তাকে সমানভাবে অপছন্দ করেন।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সামনেই নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে তার দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের (সিনেট ও হাউজ) নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিরোধীরা ট্রাম্পের একতরফা ফরমান জারি করে দেশ চালানোর বাতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘায়েল করতে বিচার বিভাগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের নিন্দা জানাচ্ছেন।

এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষায় অনীহা ও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি বিশেষ অনুরাগ এবং শান্তির বুলি আউড়ে ক্ষমতায় এসে মার্কিন সামরিক পেশিশক্তি প্রদর্শনের নেশারও তীব্র সমালোচনা করছেন তারা।

‘নো কিংস’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাবেক সেনাদের সংগঠন ‘কমন ডিফেন্স’—এর নাভিদ শাহ বলেন, আমাদের গত পদযাত্রার পর থেকে এই প্রশাসন আমাদের আরও গভীরভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের ভেতরে আমরা দেখেছি রাজপথে সামরিকায়িত বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। আমরা দেখেছি কীভাবে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং অভিবাসী সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এসব কিছুই করা হচ্ছে একজন মানুষের নামে, যিনি রাজার মতো দেশ শাসন করতে চাইছেন।

মিনেসোটায় ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক ও কিংবদন্তি রকার ব্রুস স্প্রিংস্টিন

আয়োজকদের তথ্যমতে, বড় শহর থেকে শুরু করে শহরতলী ও গ্রামাঞ্চল—এমনকি উত্তর মেরু অঞ্চলের (সুমেরু বৃত্ত) আলাস্কার কোটজেবু শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। তবে এসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য মিনেসোটা।

মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল—এই টুইন সিটিতে অভিবাসীদের ওপর ট্রাম্পের সহিংস দমন-পীড়ন নিয়ে জাতীয় বিতর্কের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন বামপন্থী রাজনীতিক বার্নি স্যান্ডার্স মিনেসোটার সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, আমরা এমন একজন প্রেসিডেন্টকে কখনোই মেনে নেব না, যিনি একজন জন্মগত মিথ্যাবাদী (প্যাথলজিক্যাল লায়ার), চোর (ক্লেপ্টোক্র্যাট) এবং চরম আত্মমুগ্ধ (নার্সিসিস্ট); যিনি প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের শাসনকে অবজ্ঞা করছেন।

ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক ও কিংবদন্তি রকার ব্রুস স্প্রিংস্টিন মিনেসোটার রাজধানী সেন্ট পলে তার ‘স্ট্রিটস অব মিনিয়াপোলিস’ গানটি গেয়ে শোনান। সেখানে তখন কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল।

স্প্রিংস্টিন এই প্রতিবাদী গানটি (ব্যালাড) মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখে রেকর্ড করেছিলেন। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতিবাদে চলা আন্দোলনের সময় ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে নিহত দুই মার্কিন নাগরিক—রেনি গুড এবং অ্যালেক্স প্রেটির স্মরণে তিনি গানটি তৈরি করেন।

গান শুরু করার ঠিক আগে স্প্রিংস্টিন বলেন, তাদের সাহসিকতা, তাদের আত্মত্যাগ এবং তাদের নাম কখনোই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে না।

Popular

More like this
Related

নিজেদের মতো সংবিধান ব্যাখ্যা করছে বিএনপি: নাহিদ ইসলাম

সংবিধানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিএনপি সরকারের আচরণে দ্বিচারিতা রয়েছে বলে...

১১ জেলায় নতুন ডিসি

সরকার দেশের ১১টি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ...

নেপালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর জ্বালানিমন্ত্রী গ্রেপ্তার

নেপালের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী দীপক খাড়কাকে আজ রোববার গ্রেপ্তার করা...

ইসরায়েলে দ্বিতীয় দফায় হামলার খবর নিশ্চিত করল হুতিরা

ইসরায়েলের দক্ষিণের বিভিন্ন অংশে দ্বিতীয় দফায় হামলার খবর নিশ্চিত...