যখন খেলাধুলা খুলে দেয় শ্রেণিকক্ষের দরজা

Date:

“আমি যদি টেবিল টেনিস না খেলতাম, তাহলে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার সুযোগই পেতাম না।”

রিফাত মাহমুদ সাব্বির কথাটি খুব সরলভাবেই বলেন। এমন এক খেলায় বছরের পর বছর অনুশীলন, যেখানে আর্থিক নিশ্চয়তা খুবই কম, তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে একটি পদকের চেয়েও অনেক বেশি স্থায়ী কিছুর দ্বারপ্রান্তে। ২০১৯ সালের সাউথ এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জজয়ী সাব্বির এখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) থেকে মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিষয়ে তার স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার খুব কাছাকাছি, টেবিল টেনিসে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পাওয়া পূর্ণ স্কলারশিপে।

তিনি বলেন, “আইইউবি যদি আমাকে পূর্ণ স্কলারশিপ না দিত, তাহলে হয়তো আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারতাম না। টেবিল টেনিসের কারণেই পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছি, আর এখন শেষ করতে পারলে একটা চাকরি পাওয়ার আশা করি।”

তার এই পথচলা ক্রিকেট ও ফুটবলের বাইরে বাংলাদেশের অনেক ক্রীড়াবিদের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। তারা নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, কিন্তু আর্থিক স্থিতি অনিশ্চিতই থেকে যায়। ফলে প্রতিযোগিতার পরের জীবনের জন্য শিক্ষা হয়ে ওঠে একটি সেতু।

এই পথের সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত রামহিম লিয়ান বাউম। পুরুষদের দুই নম্বর খেলোয়াড় তিনিও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ব বিষয়ে পড়ছেন, তাও পূর্ণ স্কলারশিপে।

রামহিম বলেন, “আমি যদি গ্র্যাজুয়েট হতে পারি, তাহলে খেলাধুলার সঙ্গেই থাকতে চাই, এমনকি ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবেও।” তিনি উল্লেখ করেন, টিউশন ফি প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো হতে পারে, যা সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্প্রতি সাব্বির ও রামহিম মিলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরুষ দলগত শিরোপা জিততে সহায়তা করেন শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টেবিল টেনিস উৎসবে। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন জাতীয় দলের খেলোয়াড় এবং শিক্ষার্থী-ক্রীড়াবিদরা, যাদের অনেকেই স্বপ্ন আর অনিশ্চয়তার ভার একসঙ্গে বহন করছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন দেশের এক নম্বর পুরুষ খেলোয়াড় মুহতাসিন আহমেদ রিদয়, জাতীয় রানার্সআপ সাদিয়া রহমান মৌ এবং নবম স্থানে থাকা সামান্থা হোসেন তুশি, সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।

পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করা মৌ পরে নারী এককের শিরোপাও জেতেন। তবে টেবিলের ফলাফলই তার একমাত্র অগ্রাধিকার নয়।

তিনি বলেন, “একটি ক্রীড়া ক্যারিয়ার যেকোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষা থাকলে আমাদের ভরসা করার মতো কিছু থাকে।”

বাংলাদেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই ক্রীড়াবিদদের জন্য স্কলারশিপ ও কোটা ভিত্তিক ভর্তি সুবিধা বাড়িয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন আইইউবি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি–বাংলাদেশ এবং নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় খেলোয়াড় কোটা মাধ্যমে সুযোগ দিচ্ছে।

সাব্বিরের জন্য এখন স্নাতক ডিগ্রি অর্জন হাতের নাগালে। পদকগুলো রয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে, কিন্তু যেই শিক্ষার দুয়ার তারা খুলে দিয়েছে, সেটিই হয়ে উঠেছে তার পরবর্তী জীবনের দৃঢ় ভিত্তি।

 

Popular

More like this
Related

ওসিকে গালাগাল: বাহুবল উপজেলা বিএনপি সভাপতি আটক

হবিগঞ্জের বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) মুঠোফোনে গালিগালাজ করার...

মানুষের ভালোবাসাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি: সোহেল রানা

সোহেল রানা—‘ওরা ১১ জন’ সিনেমার প্রযোজক এবং ‘মাসুদ রানা’...

গাজী মাজহারুল আনোয়ায়ের লেখা চলচ্চিত্রের ১০ কালজয়ী গান

বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতজগতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের নাম শাশ্বত...

‘হাসছে’ জীবাশ্ম

নর্থাম্বারল্যান্ডের হলি আইল্যান্ডে হাঁটছিলেন ৬৪ বছর বয়সী ক্রিস্টিন ক্লার্ক।...