পারস্য উপসাগর এলাকায় ইতোমধ্যে রণতরি ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ অবস্থান করছে। এখন সেখানে যোগ দিচ্ছে ‘জেরাল্ড আর. ফোর্ড’। ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে রণতরি জোরাল্ডকে পশ্চিম এশিয়ায় আনা হচ্ছে ইরানকে ‘ভয়’ দেখানো জন্য। তবে তা ভিন্ন কোনো বার্তা বহন করছে কি?
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নর্থ ক্যারোলিনায় ফোর্ট ব্র্যাগ সেনাঘাঁটিতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বলেন—পরমাণু বিষয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো ‘কঠিন’ হয়ে পড়ছে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য তেহরানকে ‘ভয়’ দেখানো দরকার।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় রণতরি পাঠানোর কথাও সেনাদের জানিয়ে রাখেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, ‘একমাত্র ভয়ই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে।’
মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতির এমন বার্তায় মনে হতে পারে যে—মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে ‘যুদ্ধের আগুন’ যেন নেভানোই যাচ্ছে না কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টায়। তাই আবারও রণতরির ‘রণডঙ্কা’ শোনা যাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়।
যুক্তরাষ্ট্র গত বছর জুনে ইরানের ওপর যে হামলা চালিয়েছিল সে ঘটনার কথাও ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তুলে ধরেন।
অর্থাৎ, আবারও যেন বোমা-বারুদের গন্ধ। আবারও যেন হামলায় বিধ্বস্ত অবকাঠামো আর হতাহতদের ছবি সংবাদমাধ্যমে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়—সেনাদের সামনে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির প্রথাগত শিষ্টাচার ভেঙেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেনাঘাঁটিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস বা আইনসভা নির্বাচনে ডেমোক্র্যেটরা জিতলে সেনাদের স্বার্থ ছোট করে দেখা হবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-মিত্রদের সংঘাত মেটাতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি উপসাগরীয় দেশ ওমানের মধ্যস্থতায় মাসকাটে আয়োজন করা হয়েছিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা। সেই আলোচনার পর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে আয়োজিত বৈঠক ‘একটি শুভ সূচনা’।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
একই দিনে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ডোনাল্ড ট্রাম্পও মনে করছেন যে মাসকাটে ইরানের সঙ্গে হয়ে যাওয়া প্রথম দফা আলোচনা ভালো হয়েছে। তিনি আশা করছেন আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।
এরপর আলোচকরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যান তাদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য।
একই দিনে রয়টার্সের অপর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে জেনেভায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে এতে আরও বলা হয়—সেদিন মার্কিন দূত স্টিভ ইউটকফ ও জারেড কুশনার ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন। ওমানের প্রতিনিধিরা সেই আলোচনাতেও মধ্যস্থতা করবে।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে ইরানের মেহের সংবাদ সংস্থা একই তথ্য প্রচার করেছে। অপর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদ সংস্থাটি আরও জানায়, ওমানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বার্তা পেয়েছেন।
আর সেদিন বিকেলে ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মার্কিন দূতরা প্রায় ৪ বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করার আশায় কথা বলবেন বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এদিকে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছিল—আলি লারিজানি বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। ওমানে প্রথম দফা আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা শুধু ‘বার্তা আদান-প্রদান’ করেছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা ইসরায়েল বানচাল করতে চায় বলেও অভিযোগ করেছেন ইরানের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিব। ইসরায়েল উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন যুদ্ধ টেনে আনতে চায় বলেও অভিযোগ ইরানি কর্মকর্তার।
তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিবিসি জানিয়েছে যে, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা চালিয়ে যেতে চান।
কিন্তু, গত ৮ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরায় প্রকাশিত এক মতামত নতুন করে ভাবনার খোরাক যোগায়। এর শিরোনাম ছিল: ‘মাসকাটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা কালক্ষেপণ মাত্র, চুক্তির জন্য নয়’।
এতে বলা হয়, মধ্যস্থতার মাধ্যমে কূটনৈতিক আলোচনা আবারও শুরু হলো। তবে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও সামরিক চাপ দেখে প্রশ্ন জাগছে—আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দুই পক্ষের হাতে আসলেই কত সময় আছে।
এতে আরও বলা হয়, মাসকাটে প্রথম দফা আলোচনা থেকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে—আসলে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কালক্ষেপণের কৌশল ছিল কিনা।
ইরানের ভেতরে যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চরমে এবং সেই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করছে সরকার, তখন তেহরানকে আলোচনা করতে হচ্ছে ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে বিবেচিত ওয়াশিংটন ডিসির সঙ্গে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য: ইরানকে এখন ‘ঘর-বাইরে’ সব ‘শক্রকেই’ সামলাতে হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় লন্ডনভিত্তিক ইরান সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—আলোচনার ক্ষেত্রে তেহরান নিজ দেশে ‘বাঘ’, আর দেশের বাইরে ‘বেড়াল’।
প্রতিবেদন অনুসারে—ইরান সরকার নিজ দেশের জনগণকে বলছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপের কাছে ‘মাথা নত’ করবে না। আবার অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তেহরানকে ‘নতজানু’ ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো আরও বলছে: ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে প্রস্তুত। বিনিময়ে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আর সব দাবি ইরান প্রত্যাখ্যাত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র চায়—ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ হোক। হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের সমর্থন দেওয়া বন্ধ হোক। ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ আছে।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিবিসি জানায়—‘স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে ইরান পরমাণু স্থাপনার কাছে ভূগর্ভস্থ ভবনের নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে’। আরও বলা হয়—ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের কোলাং গাজ লা পর্বতে সুড়ঙ্গগুলোকে সুসংহত করার দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (আইএসআইএস) স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি—পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন চুক্তি না হলে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হবে। এ জন্য সব প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রক্ষার জন্য ইরান সেই ভূ-গর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে, সত্যিই কী উদ্দেশ্যে এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অনেকের ভাষ্য: ইরানের ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা তলানিতে। তারা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘যেকোনো মূল্যে’ সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত। তা না হলে তাদের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন—ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা আঁচ করা মুশকিল। তারা ইরানের শাসকদের সরাতে যেকোনো কৌশল নিতে পারে। তারা ইরানের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে এটাই স্বাভাবিক।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ইরানজুড়ে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার সমর্থকদের গুলিতে নিহত প্রিয়জনদের ছবি-ভিডিও প্রচার করছেন প্রবাসী ইরানিরা। নিহতদের স্মরণে আয়োজিত চেহলামের ছবিও প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।
বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি বাহিনীর নির্যাতন, দমনপীড়ন ও তাদের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে প্রবাসী ইরানিরা বিশ্বব্যাপী সভা-সমাবেশের আয়োজন করছে। হাজারো মানুষের হত্যাকারী ইরান সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানাচ্ছেন প্রবাসী ইরানিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়—১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ক্ষমতাসীনদের নির্যাতনে দেশত্যাগী ইরানিরা দেশে দেশে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন।
আয়োজকরা মিউনিখ, লস অ্যাঞ্জেলেস ও টরন্টোকে প্রতিবাদ-সমাবেশের প্রধান জায়গা হিসেবে ঘোষণা দিলেও সিডনি ও মেলবোর্নে হাজারো মানুষ ইরান সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভি তেহরানের বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে ‘বৈশ্বিক ব্যবস্থা’ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। যদিও, ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে দোষারোপ করছে।
এদিকে, একই দিনে ইসরায়েলি দৈনিক টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে বলছে—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বলা হয়—চীনে ইরানি তেলে বিক্রির সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এমনকি, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক কোনো সুফল বয়ে আসবে না বলেও মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ কেউ।
আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়—‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন যে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সমঝোতার মাধ্যমে ইরান-সমস্যার সমাধান করতে পছন্দ করছেন।’
এমনকি, আগামীকালও যদি অনুরোধ পাঠানো হয় তাহলে ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রুবিওর বক্তব্য—‘আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি যে, যদি আয়াতুল্লাহ আগামীকাল বলেন যে তিনি রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে চান তাহলে রাষ্ট্রপতি তা করবেন। আয়াতুল্লাহর মতবাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যে একমত তা নয়, বরং ট্রাম্প চান এভাবে পৃথিবীর সমস্যাগুলোর সমাধান করতে।’
আসলে এসব কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে চাচ্ছে কি না এখন তাই দেখার বিষয়।