বিদেশি কর্মী নিয়োগের আইন কঠোর করছে মালয়েশিয়া, যা জানা গেল

Date:

তুলনামূলক কম খরচে কাজের সুযোগ, কম দূরত্ব, উন্নত জীবনযাত্রার মান ও বিভিন্ন খাতে কাজের সুবিধা থাকায় বাংলাদেশসহ আশেপাশের কয়েকটি দেশের অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ জনগোষ্ঠীর জন্য মালয়েশিয়া খুবই পছন্দের গন্তব্য। 

তবে সম্প্রতি জানা গেছে,  বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশটি।  

সে অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের নীতিমালা আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। 

যার ফলে ওই দেশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বিদেশি কর্মীরা উদ্বেগ আশংকায় পড়েছেন। 

আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা। 

চলতি বছরের জুন মাস থেকে বিদেশি কর্মীদের ভিসা পাওয়ার শর্ত বদলে যাচ্ছে। 

প্রস্তাবিত বিধি মতে, ‘কম বেতনের’ চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়া আসতে ইচ্ছুক মানুষরা বিপাকে পড়বেন। 

তিন ক্যাটাগরির কাজের ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত ন্যুনতম বেতনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। 

পাশাপাশি, এখন থেকে বিদেশি কর্মীরা সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় থাকার অনুমতি পাবেন। 

এরপর তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরতে হবে নিজ দেশে, বা খুঁজে নিতে হবে বিকল্প গন্তব্য। 

এই উদ্যোগে নিয়োগকর্তাদেরও খরচ বেড়ে যাবে—একই কাজের জন্য কর্মীদের দ্বিগুণ বেতন দিতে বাধ্য হবেন তারা।

 

বিজনেস কনসালট্যান্ট সঞ্জিত মন্তব্য করেন, ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমরা এ ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানতে পারিনি। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে এটা এসেছে।’

ছদ্মনাম ব্যবহার করে আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেন চল্লিশোর্ধ এই ভারতীয় নাগরিক। 

তিনি জানান, দশ বছরের বেশি সময় মালয়েশিয়ায় থেকে তিনি এই দেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও কাজের পরিবেশের সঙ্গে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছেন। 

তবে সরকারের এই উদ্যোগে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। 

তিনি মত দেন, ‘এই পরিস্থিতিতে বাড়ি-গাড়ি কেনার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো সংশয়ের মুখে পড়েছে। 

 

গত কয়েক দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোর একটিতে রূপান্তরিত হয় মালয়েশিয়া। বিদেশি কর্মীদের পছন্দের গন্তব্য হিসেবে দেশটি সুপরিচিত। 

দেশটিতে ২১ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি কর্মীদের অনেকেই ন্যুনতম মাসিক বেতনে কায়িক শ্রমনির্ভর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ ধরনের কাজের গড় বেতন মাসে এক হাজার ৭০০ রিঙ্গিত (প্রায় ৫২ হাজার টাকা)।

সে তুলনায় ছোট এক দল বিদেশি উচ্চ বেতনে বিশেষায়িত পদে চাকরি করে থাকেন। সাধারণত অর্থায়ন, সেমিকন্ডাক্টর, তেল ও গ্যাসের মতো খাতে তারা নিয়োগ পান। 

২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফউদ্দিন নাসুশিয়ন জানান, দেশটিতে কর্মরত উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকরা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত (১৯ বিলিয়ন ডলার) খরচ করেছেন। 

 

একইসঙ্গে তারা বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত (২৫ মিলিয়ন ডলার) কর দিয়েছেন। 

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের দেশটিতে বিদেশি শ্রম নিয়ে বিতর্ক বেড়ে চলেছে। 

২০২৫ সালে প্রণীত সর্বশেষে পাঁচ বছর মেয়াদী জাতীয় নীতিমালা কৌশলে সরকার হুশিয়ারি দেয়, ধারাবাহিকভাবে স্বল্প-দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করায় দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

ত্রয়োদশ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা নামের নথিতে উল্লেখ করা হয়, স্বল্প বেতনে বিদেশি এবং অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা শ্রম বাজারে প্রভাব ফেলেছে। এতে বেতন কাঠামোয় ভারসাম্যের অভাব দেখা দিয়েছে এবং সার্বিকভাবে উপযোগিতা কমেছে। 

সরকার স্থানীয়দের থেকে নিয়োগ বাড়ানোকে উৎসাহিত করতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ কমাতে চাইছে। 

২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, কর্মীদের ১৪ দশমিক এক শতাংশ বিদেশি নাগরিক। ২০৩৫ সাল নাগাদ একে পাঁচ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। 

জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, উচ্চ বেতন পাওয়া বিদেশি কর্মীদের জন্যেও নীতিমালা কঠোর হবে, যাতে তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে টেকসই অবদান রাখতে পারেন। 

একইসঙ্গে দেশের নাগরিকদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। 

 

তিন ক্যাটাগরির কাজের ক্ষেত্রে নতুন নীতিতে পরিবর্তন আসছে। 

সবচেয়ে কম তিন হাজার রিঙ্গিত বেতনে বিদেশি কর্মীরা কাজ করার অনুমতি পেতেন। সেই সীমা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার করা হয়েছে। 

পরের ধাপের কাজের জন্য ন্যুনতম বেতন পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার রিঙ্গিত করা হয়েছে। 

সর্বশেষ ধাপে ন্যুনতম বেতনের বাধ্যবাধকতা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার রিঙ্গিত করা হয়েছে। 

বেতন দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় পরিবর্তনের পাশাপাশি এখন থেকে আর বিদেশি কর্মীরা বছরের পর বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করে যেতে পারবেন না। নিয়োগদাতারা বিদেশি কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ দিতে বাধ্য হবেন। 

তবে বর্তমানে যারা ন্যুনতম বেতনে কাজ করছেন, তাদের ভাগ্যে কি আছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। 

 

যুক্তরাজ্যের নাগরিক থমাস মিড ২০২২ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনায় বিদেশি নাগরিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। 

২৮ বছর বয়সী ব্যবস্থাপক মিড বলেন, ‘ন্যুনতম বেতনের এসব নিয়ম সব সময়ই ছিল। তবে হুট করে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার রিঙ্গিত করে দেওয়া খুবই বিস্ময়কর।’

সিঙ্গাপুর থেকে আসা উদ্যোক্তা ডগলাস গ্যান বলেন, নতুন নিয়মে প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বেড়ে যাবে। 

তিনি মত দেন, যারা বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দেন, তারা আর নতুন নিয়নে সেসব কর্মীদের আনতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি চীনের দ্বিতীয় সারির শহরগুলোতে বসবাসকারী প্রকৌশলীদের কথা উল্লেখ করেন। 

 

‘যদি বেতন বেড়ে ১০ হাজার রিঙ্গিত করে দেওয়া হয়, তাহলে আর প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরকে নিয়োগ দেবে না’, যোগ করেন তিনি। 

গ্যান জানান, স্থানীয় কর্মী নিয়োগকে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়ে তার আপত্তি নেই। তবে বিভিন্ন খাতের চাহিদা ও প্রভাব বিবেচনা করে সরকারের উচিৎ ভিন্ন ভিন্ন নীতিতে যাওয়া—এ রকম ঢালাও নীতি বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক ক্ষাতকে বিপর্যস্ত করবে বলে মত দেন তিনি। 

মালয়েশিয়ার ভিডিও গেমস খাতে কাজ করে ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক লিওনার্দো। তিনি জানান, নতুন নিয়মে দ্বিতীয় ক্যাটাগরি থেকে তৃতীয় ক্যাটাগরিতে অবনমন হয়েছে তার। 

লিওনার্দো ভেবেছিলেন ইন্দোনেশিয়া থেকে নিজের মা কে এখানে নিয়ে আসবেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিষয়টি এখন সংশয়ে পড়েছে। 

কুয়ালালামপুরভিত্তিক ব্যাংক কেনাংগার অর্থনৈতিক গবেষণা প্রধান ওয়ান সুহাইমি মত দেন, স্থানীয়রা দক্ষতা অর্জন করলেই শুধু তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হবে। 

 

‘সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হওয়া উচিৎ বিদেশিদের আসা বন্ধ না করে স্থানীয়দের দক্ষ করে তোলা’, যোগ করেন তিনি। 

এফএসজি এডভাইজরি নামের প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী অ্যান্থনি ডাস মত দেন, এই নীতিমালা থেকে মালয়েশিয়া কী ভাবে উপকৃত হবে, তা নির্ধারণ হবে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রণীত নীতিমালার কার্যকারিতা থেকে। 

ভারতীয় নাগরিক সঞ্জিত বলেন, ‘মালয়েশিয়া যদি সব দিক বিবেচনা না করে এ ধরনের নীতি চালু করে, তাহলে আমার মতো মানুষরা ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য বিদেশি কর্মীবান্ধব দেশে বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে নেবে।’

Popular

More like this
Related

স্বাধীনতা দিবসে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার শুভেচ্ছা

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে...

ইসরায়েলকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে যোগ দেবে উগান্ডা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইসরায়েলের পরাজয় বা ধ্বংসের সম্ভাবনা দেখলে...

ইরানকে এখনই আলোচনায় বসতে হবে, পরে সুযোগ থাকবে না: ট্রাম্প

দেরি হওয়ার আগেই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায়...

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পরোক্ষ আলোচনা চলছে: পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ...