ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর পুনরায় শুরু হলো গণতন্ত্রের পথচলা। নির্বাচিত সাতজন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনজনই ঠাঁই পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়। তাদের একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। অর্থাৎ, নির্বাচিত নারীদের ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। এ অর্জনে শুভ কামনা। সেইসঙ্গে একরাশ শঙ্কা রয়েছে নারীর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে।
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও সামাজিক রূপান্তরের ফল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল বহুমাত্রিক—যোদ্ধা, সংগঠক, আশ্রয়দাতা, তথ্যসংগ্রাহক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও তারা সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নারীর সমানাধিকারের স্বীকৃতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি ও বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্যে যে ব্যবধান, সেখানেই নারীর পিছিয়ে পড়া। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি ক্ষেত্র বিশেষে দৃশ্যমান হলেও চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে ৩৫০টি আসন। এর মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন, যা মোট আসনের প্রায় ১৪ শতাংশ। এটি সরাসরি নির্বাচিত ও সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে সংসদে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে; অন্যদিকে সরাসরি নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ ও জয়ের হার কম থাকায় প্রকৃত গণভিত্তিক ক্ষমতায়ন প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে। সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। ফলে তাদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দলীয় কাঠামোয় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তথাকথিত অগ্রগতির পালে গত ১৮ মাসে নারীর প্রতি সামাজিক মনোভাবের যে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন হয়েছে, তাতে নারীর টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সংসদের প্রতিটি অধিবেশন অনুযায়ী সদস্য সংখ্যার তথ্য, আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ) প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী সংসদে নারীর অংশগ্রহণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতকৃত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে জানা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদে (১৯৭৩) নারী সদস্য ছিলেন ১৫ জন, যা মোট সদস্যের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান বলছে, পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে ৩২ জন বা ৯ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে ৩৩ জন বা ১০ শতাংশ, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদে ৪ জন বা ১ দশমিক ৩ শতাংশ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে ৩৫ জন বা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদে ৩৩ জন বা ১০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে ৩৮ জন বা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে ৫২ জন বা ১৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০০৮ সালে নবম সংসদে ৭১ জন বা ২০ শতাংশ, ২০১৪ সালে দশম সংসদে ৬৯ জন বা ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৮ সালে একাদশ সংসদে ৭২ জন বা ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদে ৬৯ জন বা ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য ছিলেন।
এই পরিসংখ্যানকে অনেকে অগ্রগতির সূচক হিসেবে দেখলেও মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী এমপির সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র সাত জনে বা প্রায় ২ দশমিক ৩৩ শতাংশে। গত পঁচিশ বছরে এটি সর্বনিম্ন। সংখ্যাগত উপস্থিতি ও গণভিত্তিক নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব—এই দুইয়ের ফারাক আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীরা শীর্ষ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে অনন্য উদাহরণ। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনই দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি কি সামগ্রিকভাবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে? নাকি এটি সীমিত সংখ্যক পরিবারের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা। গ্রামীণ ও শহুরে উভয় সমাজেই রাজনীতি এখনো পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। অধিকাংশ নারী প্রার্থী অর্থনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক সহিংসতা ও চরিত্রহননের সংস্কৃতিও নারীদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জীবনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম।
দলীয় কাঠামোতেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরামে নারীর প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। ফলে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে নারীর কণ্ঠস্বর দুর্বল থাকে। সংরক্ষিত আসন থাকা সত্ত্বেও সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকেন। এতে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়, যেখানে নারী রাজনীতিবিদরা দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
তৃণমূল পর্যায়ে অবশ্য চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত আসনে বিপুল সংখ্যক নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় সরকারে নারীর এই উপস্থিতি রাজনৈতিক চর্চার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে গবেষণা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই নারী জনপ্রতিনিধিরা কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান না। পরিবার বা স্থানীয় প্রভাবশালী পুরুষ নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে সেখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। ফলে প্রতিনিধিত্বের আড়ালে কার্যত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো অটুট থাকে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও পর্যালোচনা জরুরি। ইউএন উইমেনের ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারস অন উইমেন্স লিডারশীপ অ্যান্ড পলিটিকাল পার্টিসিপেশনের তথ্য মতে, বৈশ্বিক গড়ে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২৬–২৭ শতাংশের কাছাকাছি। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সেটা পেরিয়ে গেছে। যেমন: নেপাল ৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাংলাদেশে সংরক্ষিত আসনসহ মোট প্রতিনিধিত্ব ২০ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম। এই বৈপরীত্যই আমাদের মূল সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বিশেষ করে লক্ষ্য-৫—লিঙ্গসমতা অর্জন—বাস্তবায়নে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণের টেবিলে নারীর উপস্থিতি না থাকলে নারী ও শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ন্যায্য অগ্রগতি সম্ভব নয়।
গবেষণা বলছে, যেখানে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে সামাজিকখাতে বিনিয়োগ ও জবাবদিহিতা তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, সরাসরি নির্বাচনে বাধ্যতামূলক নারী প্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে প্রতিটি দল নির্দিষ্ট শতাংশ নারী প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত, সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার করে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ‘ব্যতিক্রম’ নয়, বরং ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে নেতৃত্বে নারীর ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা জরুরি। এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন মাধ্যমে আগামী ১০–১৫ বছরে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩০-৪০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা যে হারে কমেছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় বরং আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রার অশনিসংকেত। সংখ্যার পেছনের বাস্তবতা বিশ্লেষণ না করলে আমরা হয়তো বাহ্যিক অগ্রগতির মোহে থেকে যাব, কিন্তু অন্তর্গত পিছিয়ে পড়া থেকে মুক্তি পাবো না।
এবারের পুরুষ শাসিত সংসদে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের নারী উন্নয়নের উদ্যোগ দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, এটি গণতন্ত্রের গুণগত মান উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আমরা কি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে এগোবো, নাকি সংখ্যার হিসাবেই সন্তুষ্ট থাকব অথবা রাজনীতির মাঠে গালির উপকরণেই থেকে যাবো—এই প্রশ্ন এখন আমাদের সবার সামনে।
তানজিনা পৃথা, গণমাধ্যম কর্মী