ফ্যামিলি কার্ড ও টাকা দেওয়ার নামে অনলাইন চক্রের ‘ডিপফেক’ প্রতারণা

Date:

গত ২২ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। তাদের সামনে টেবিলে রাখা বিপুল পরিমাণ টাকা। এআই সংশ্লেষিত কণ্ঠে তারেক রহমান বলছেন, ‘দেশবাসী, আমি আপনাদের জন্য সেনা সদস্যদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড ও টাকা দিচ্ছি। যারা এখনো কিছু পাননি, তারা দ্রুত ফলো, শেয়ার এবং কমেন্ট করুন।’

চারদিন পর একটি রিলে তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে একটি ডিপফেক ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, তিনি গ্রামে ঘুরছেন এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা দিতে চান।

তিনি বলেন, ‘আপনারাও যারা পেতে চান, তারা পেজটি ফলো আর শেয়ার করে কমেন্টে বিকাশ অথবা নগদ নম্বর দিন।’

কমেন্ট সেকশন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বহু ব্যবহারকারী এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন এবং ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর শেয়ার করছেন।

ফেব্রুয়ারি ১৯ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টার ৫২টি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করেছে। ভিডিওগুলোতে তারেক রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যরা ফ্যামিলি কার্ড বা টাকা উপহার দিচ্ছেন। পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব মিথ্যা অফার মূলত পেজগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়াতে দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে মোবাইল নম্বর ও ঠিকানার মত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ডেইলি স্টার ভিন্ন ভিন্ন নামের অন্তত ৩১টি পেজ এবং গ্রুপ পেয়েছে, যারা গত মাসে সাত দিনব্যাপী এসব প্রতারণামূলক অফারের প্রচারণা করেছে।

ডেইলি স্টারের তরফ থেকে অন্তত সাতটি পেজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব জানায়, এসব ভিডিও তৈরির প্রাথমিক উদ্দেশ্যই হলো ফলোয়ার বাড়িয়ে পেজগুলো বিক্রি করা।

‘জনতার ইনকিলাব’ নামের একটি ফেসবুক পেজের এডমিন মোহাম্মদ সজল শেখ ডিসমিসল্যাবকে জানান, মনিটাইজেশনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বদলে এআই জেনারেটেড ভিডিও ব্যবহার করে তারা দ্রুত পেজের ফলোয়ার বাড়ায় এবং পরবর্তীতে লাভের জন্য সেগুলো বিক্রি করে দেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫২টি ফেসবুক পোস্টের মধ্যে ৩২টিতে সরাসরি তারেক রহমানের ডিপফেক এবং ১৩টিতে জাইমা রহমানের ডিপফেক ব্যবহার করা হয়েছে। কমপক্ষে ৭টি ভিডিওতে ডা. জোবাইদা রহমানসহ জিয়া পরিবারের তিন সদস্যকে দেখতে পাওয়া যায়। অন্তত ৩১টি ভুয়া পোস্টে এসব প্রতারকরা পেজে লাইক, ফলো—এসবের বদলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরও ১৫টি পোস্টে টাকা উপহারের বদলে লাইক, কমেন্ট চাওয়া হয়েছে।

গত ১৮ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি কিছুটা ভিন্ন বানানে জাইমা রহমানের নাম দিয়ে দুটি ফেসবুক পেইজ তৈরি করা হয়েছে। মাত্র ৭ দিনের মধ্যে একটি পেজে ৫৭ হাজার অনুসারী এবং অপর পেজে ৩২ হাজার অনুসারী রয়েছে, যা পেজগুলোর দ্রুত বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

জাইমা রহমানের অনুকরণে বানানো দশ সেকেন্ডের একটি ডিপফেক ভিডিওতে তাকে বলতে দেখা যায়, ‘আজ রাত ১২টার সময় ৫ হাজার মানুষকে ৫ হাজার করে টাকা দেয়া হবে।’ ভিডিওতে আরো বলা হয়, যারা ভিডিওটি শেয়ার করবে তারাই টাকা পাবে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ভিডিওটি ৩ লাখ ১০ হাজার বার দেখা হয়েছে।

পোস্টগুলোর কমেন্ট সেকশনে অনেক বিকাশ নাম্বার দেখতে পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত ঠিকানাও কমেন্টে দিতে দেখা যায়।

তারেক রহমানের অনুকরণে তৈরি অন্য একটি ডিপফেক ভিডিওতে তারেক রহমানকে দর্শকদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বিকাশ ও নগদ নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়, যারা এখনো নিজেদের নম্বর দেয় নি তাদের দ্রুত দেওয়া উচিত, কেননা বিজয়ীদের নাম চার ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা করা হবে।

সরকার পাইলট ভিত্তিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রোগ্রাম চালু করেছে। এই উদ্যোগের আওতায়, নির্বাচিত এলাকার ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবার ঈদের আগে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবে। প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে পরিচালিত এই প্রোগ্রামটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অংশেও সম্প্রসারিত হবে।

তবে, আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার আগেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে, যেখানে মিথ্যা দাবি করা হয়েছে—ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এর সঙ্গে ভুয়া অফারও রয়েছে।

ডিজিটাল মাধ্যম গবেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাঈদ আল জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ ধরণের ডিপফেক ভিডিও ব্যবহারকারীদের একটি বিশেষ ধরণের কনটেন্ট শেয়ার করার জন্য উৎসাহিত করে। ডিজিটাল সাক্ষরতা সীমিত হওয়ার কারণে অনেকেই এতে অংশ নেয় আর ভিডিওগুলো আরও ছড়িয়ে দেয়। এসব কনটেন্ট যারা তৈরি করে তারা ফেসবুকের মাধ্যমে আয় করে।’

একইসঙ্গে, মোবাইল নম্বর, বিকাশ নম্বর ও বাড়ির ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত তথ্যগুলো এই প্রতারকদের হাতে চলে যায়। এই তথ্যগুলো পরবর্তীতে নানা ধরণের প্রতারণায় ব্যবহার করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারিত করা হয়, বাংলাদেশও যার ব্যতিক্রম নয়।’

ব্যবহারকারীরা স্বেচ্ছায় নিজেদের নাম, ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর সামাজিকমাধ্যমে শেয়ার করে নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং আর্থিক সুরক্ষার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইউএনসিটিএডির ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট ২০২১ অনুসারে, ‘ইন্টারনেটে তথ্য সম্পর্কিত প্রচুর নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তথ্য লঙ্ঘন, পরিচয় চুরি, ম্যালওয়্যার, র‍্যানসমওয়্যার এবং অন্যান্য ধরণের সাইবার অপরাধ।’

ইন্টারপোল সতর্ক করে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অপরাধের একটি অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সাইবার অপরাধীরা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে আক্রমণ চালানোর জন্য জনসমক্ষে শেয়ার করা তথ্য ব্যবহার করে।

অনুবাদ করেছেন নওরীন সুলতানা

Popular

More like this
Related

বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, অন্ধকারে পুরো কিউবা

কিউবার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।আজ সোমবার সিএনএন...

ঝড়-বৃষ্টিতে জয়পুরহাটের ৮২১ হেক্টর জমির আলু নষ্ট, ক্ষতির মুখে জামালপুরের ভুট্টা চাষি

উত্তরবঙ্গের জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলায় গত চার দিনের বৃষ্টি...

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে ২৫ বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব বাংলাদেশের

বাংলাদেশ এক গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে ২৫ বছরে...

জামালপুরে থানার নির্মাণাধীন ভবনের ছাদধসে ৮ শ্রমিক আহত

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় নির্মাণাধীন থানা ভবনের ছাদের একটি অংশ...