প্রাজ্ঞের পিঞ্জর: স্বাধীনতা ছাড়া কি প্রকৃত গবেষক তৈরি সম্ভব

Date:

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভূমিকা কেবল নতুন প্রজন্মের কাছে বিদ্যমান জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের সীমানাকে আরও প্রসারিত করা।

বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হরণ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় আর নতুন চিন্তার আকরশালা থাকে না। এটি তখন কারখানায় পরিণত হয়। সেখানে প্রকৃত গবেষণা ও সত্যিকারের পাণ্ডিত্য বিকাশের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়।

গবেষণায় দ্বান্দ্বিকতার প্রয়োজনীয়তা

প্রকৃত গবেষণা স্বভাবগতভাবেই প্রচলিত ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে। বিদ্যমান তত্ত্বগুলো সমর্থন করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা গবেষণার কাজ নয়; বরং এটি হলো প্রচলিত ধারণার ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা।

একটি ভালো গবেষণা পদ্ধতি (সেটি বিজ্ঞান, ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান যে বিষয়েই হোক না কেন) নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত কোনো ‘তথ্য’ বা ‘ধারণা’র দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নটি করার ওপর যে ‘যদি এই ধারণাটি ভুল হয়, তবে কী হবে?’

যে পরিবেশে রাজনৈতিক বা বিশেষ কোনো আদর্শিক গোঁড়ামির কারণে বাক-স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা রুদ্ধ থাকে, সেখানে এই প্রাথমিক প্রশ্নটি করাও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষ বা ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে পেশাগত জীবন ধ্বংস হওয়া বা শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, তবে বড় কোনো উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘বৌদ্ধিক ঝুঁকি’ নেওয়ার সাহস হারিয়ে যায়।

তদুপরি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নির্ভর করে কঠোর এবং নিরপেক্ষ ‘পিয়ার রিভিউ’ বা সহকর্মী মূল্যায়নের ওপর। গবেষণা তখনই বৈধতা পায়, যখন সহকর্মীরা স্বাধীনভাবে এর দুর্বলতাগুলো ব্যবচ্ছেদ করার সুযোগ পায়। কোনো গবেষক যদি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কোনো ত্রুটিপূর্ণ গবেষণার সমালোচনা করতে ভয় পান, তবে সেই বিজ্ঞান বা সমাজবিজ্ঞান কেবল একটি ‘অনির্ভরযোগ্য প্রহসনে’ পরিণত হয়।

স্বৈরতান্ত্রিক ধাঁধা: কারিগর বনাম পথপ্রদর্শক

প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয় যে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাও ঐতিহাসিকভাবে অনেক উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন: সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচি বা নাৎসি জার্মানির রকেট প্রযুক্তির উদ্ভাবন। এতে মনে হতে পারে যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই।

তবে এই যুক্তিতে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এড়িয়ে যাওয়া হয়। একটি কঠোর শাসনব্যবস্থার অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়তো পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের মতো ‘কঠিন বিজ্ঞান’ শাখায় দক্ষ কারিগর, প্রকৌশলী বা বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে পারে। কারণ এই বিষয়গুলোকে সরাসরি রাজনৈতিক রূপ দেওয়া কঠিন। শাসকরা এই বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ল্যাবরেটরির ভেতরে কিছুটা স্বাধীনতা দিলেও ল্যাবের বাইরে তাদের কথা বলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

এর ফলে যা তৈরি হয় তাকে বলা হয় ‘নির্দেশিত গবেষণা’। এটি ‘কৌতূহল-চালিত গবেষণা’ নয়। এই বিজ্ঞানীরা আগে থেকে নির্ধারিত নির্দেশ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্তু তারা মহতী কোনো আবিষ্কার পারেন না। পৃথিবী তখন সেই সব ‘আকস্মিক আবিষ্কার’ থেকে বঞ্চিত হয়, যা ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে শেখায়। কারণ, তখন মানুষের মস্তিষ্ক অনুমোদিত সীমানার বাইরে বিচরণ করতে স্বাধীন থাকে না।

ইতিহাসের রায়: যখন তথ্যকে হঠিয়ে দেয় অন্ধবিশ্বাস

ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেয় যে, যখন রাজনৈতিক বা নির্দিষ্ট মতাদর্শকে অভিজ্ঞতাবাদী অনুসন্ধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়, তখন তার ফলাফল কী হয়। যখন রাষ্ট্র ‘সত্য’ নির্ধারণ করে দেয়, তখন গবেষণার পুরো ক্ষেত্রটিই ধসে পড়তে পারে, যা কয়েক প্রজন্মের স্থবিরতা বা বিপর্যয় ডেকে আনে। এর চারটি ঐতিহাসিক উদাহরণ দেখা যাক:

১. সোভিয়েত ইউনিয়ন ও লিসেনকোবাদ (১৯৩০-১৯৬০ দশক)

আদর্শিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হলো ট্রফিম লিসেনকোর উত্থান। লিসেনকো মেন্ডেলীয় বংশগতিবিদ্যা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ, তার মনে হয়েছিল ‘বংশগত বৈশিষ্ট্য’র ধারণাটি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের বিরোধী। স্টালিনের ছত্রছায়ায় ‘লিসেনকোবাদ’ একমাত্র সরকারি স্বীকৃত জীববিজ্ঞানে পরিণত হয়; ভিন্নমতাবলম্বী বিজ্ঞানীদের কারারুদ্ধ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর ফলে সোভিয়েত জীববিজ্ঞান কয়েক দশক পিছিয়ে যায় এবং ত্রুটিপূর্ণ কৃষি পদ্ধতির কারণে দুর্ভিক্ষে লাখো মানুষের মৃত্যু ঘটে।

২. নাৎসি জার্মানি ও ‘আর্য পদার্থবিজ্ঞান’ (১৯৩০ দশক)

ক্ষমতায় আসার পর নাৎসি শাসকরা জার্মান বিজ্ঞানকে ‘ইহুদি প্রভাব’ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। তারা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো বৈপ্লবিক ধারণাগুলোকে ‘অ-জার্মান’ বলে আখ্যা দেয়। প্রায় ১৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানীকে বহিষ্কার করা হয়। এই আদর্শিক শুদ্ধি অভিযান পদার্থবিজ্ঞানের বিশ্বকেন্দ্র হিসেবে জার্মানির অবস্থানকে ধুলিসাৎ করে দেয় এবং বিজ্ঞানের নেতৃত্ব ও আইনস্টাইনের মতো মেধাবী মানুষদের যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের হাতে তুলে দেয়।

৩. চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব (১৯৬৬-১৯৭৬)

মাও সে তুংয়ের শাসনকালে বুদ্ধিজীবীদের শ্রেণি-শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চীনজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরের পর বছর বন্ধ ছিল। যখন সেগুলো পুনরায় খোলা হয়, ভর্তির যোগ্যতা মেধাকে নয় বরং রাজনৈতিক আনুগত্যকে করা হয়। বিজ্ঞানীদের ‘পুনঃশিক্ষার’ জন্য শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। এর ফলে গবেষকদের একটি বিশাল প্রজন্ম হারিয়ে যায় এবং মৌলিক গবেষণায় এক চরম স্থবিরতা নেমে আসে।

৪. ইস্তাম্বুল মানমন্দির ধ্বংস (১৫৮০)

১৫৮০ সালে তাকি আল-দিনের ইস্তাম্বুল মানমন্দির ধ্বংস করার ঘটনাটি একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ যে কীভাবে আদর্শিক দমন একটি পুরো সভ্যতার অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে পারে। এক সময় এই মানমন্দিরটি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার বিশ্বসেরা কেন্দ্র, যেখানে ইউরোপের চেয়েও উন্নত যন্ত্রাংশ ছিল। কিন্তু ১৫৭৭ সালের ধূমকেতু এবং একটি মহামারিকে পুঁজি করে ধর্মীয় রক্ষণশীলরা দাবি করে যে, আকাশের রহস্য নিয়ে ‘নাক গলানো’ অমঙ্গল ডেকে আনে। রাজনৈতিক চাপে সুলতান মুরাদ তৃতীয় নৌবাহিনী পাঠিয়ে মানমন্দিরটি গুঁড়িয়ে দেন। এটি ছিল যুক্তিবাদী চিন্তার ওপর এক চরম আঘাত।

প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি

ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের বাইরেও স্বাধীনতার অভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এক ধরনের কাঠামোগত অবক্ষয় বা ‘পচন’ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যম মানের মেধাবী তৈরি করে। একটি অবরুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় অনিবার্যভাবে ‘মেধা পাচার’ সমস্যার সম্মুখীন হয়। কারণ, বিশ্বমানের মেধার অভাব ঘটে এবং স্থানীয় মেধাবীরা প্রথম সুযোগেই দেশ ছেড়ে পালায়। তদুপরি, শিক্ষার্থীদের মানসিকতাও কলুষিত হয়। তাদের ‘কেন?’ জিজ্ঞাসা করার পরিবর্তে ‘কী অনুমোদিত?’ তা শিখতে বাধ্য করা হয়। পরিশেষে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও সেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। কারণ, চাপের মুখে করা গবেষণাকে বিশ্ব সমাজ সন্দেহের চোখে দেখে।

বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান অত্যন্ত নাজুক একটি বিষয়। এর জন্য এমন একটি সুরক্ষিত পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে অপ্রিয় বা প্রচলিত মতের বিরোধী ধারণাও কোনো ভয় ছাড়াই পরীক্ষা করা যায়। মন যদি ‘বিপজ্জনক’ বৌদ্ধিক বিষয়ে বিচরণ করার স্বাধীনতা না পায়, তবে কোনো ক্ষেত্রেই বড় কোনো উদ্ভাবন সম্ভব নয়।

ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তি দেওয়ার নিরাপত্তা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় আর আবিষ্কারের সূতিকাগার থাকে না, বরং স্রেফ রাষ্ট্রের একটি আজ্ঞাবহ হাতিয়ারে পরিণত হয়। অন্য কথায়, বাক-স্বাধীনতা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো দক্ষ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে পারে, কিন্তু সেখানে প্রকৃত অর্থে কোনো ‘গবেষক’ তৈরি হতে পারে না।

সামিও শীশ: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Popular

More like this
Related

কক্সবাজারে গ্যাসে স্টেশনে লিকেজ, বিস্ফোরণে আহত ১৫, এলাকায় সতর্কতা

কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলীতে নবনির্মিত গ্যাস ফিলিং স্টেশনে বিস্ফোরণ ও...

যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় কী কৌশল নিচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়, দীর্ঘকাল ধরে...

দেশে ভূমিকম্প অনুভূত

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।আজ বুধবার রাত...

ডিসেম্বরে পুনঃতফসিল হয় গভর্নর মোস্তাকুরের প্রতিষ্ঠানের ৮৯ কোটি টাকার ঋণ

গত ডিসেম্বরেই মো. মোস্তাকুর রহমানের মালিকানাধীন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান 'হেরা...