পাকিস্তানি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের বিশেষত্ব কী, কেন কিনতে আগ্রহী বাংলাদেশ?

Date:

নতুন বছরের এক সপ্তাহও না পেরোতেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর বৈঠকের পর শিগগির নিজেদের তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি হতে পারে বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, সেই বৈঠকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাফল্যের প্রশংসা করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘পুরোনো বহরকে সহায়তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে আকাশ নজরদারি বাড়াতে’ সহযোগিতা চান হাসান মাহমুদ খান।

গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’

সুপার মুশশাক একটি হালকা ওজনের, দুই থেকে তিন আসনের, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমান, যার ল্যান্ডিং গিয়ার স্থির (ভাঁজযোগ্য নয়) ও তিন চাকা বিশিষ্ট। এটি মূলত প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়।

পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান ও ইরাকসহ অন্তত ১০টির বেশি দেশ পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য এই বিমান ব্যবহার করছে।

বিবৃতি প্রকাশের ঠিক একদিন পরই বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তরের বিষয়ে আলোচনা করছে। এতে দীর্ঘদিনের দুই মিত্র দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে উভয় দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের কয়েক মাস পর এই আলোচনা হয়।

এই দুই ঘটনা ডিসেম্বরের শেষ দিকে আসা প্রতিবেদনের পরপরই ঘটে, যেখানে বলা হয়েছিল—পাকিস্তান লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে, যার মধ্যে এক ডজনের বেশি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রিও রয়েছে।

যদিও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখনো লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, আর বাংলাদেশও এখন পর্যন্ত কেবল ‘আগ্রহ’ প্রকাশ করেছে—চুক্তি সই করেনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

তুলনামূলকভাবে কম দামের (প্রতি বিমানের আনুমানিক মূল্য ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার) কারণে গত এক দশকে বেশ কয়েকটি দেশ এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান ইতোমধ্যে তাদের বহরে যুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আকাশযুদ্ধে পাকিস্তানের সক্ষমতার সুনামও বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী তীব্র আকাশযুদ্ধ হয়। উভয়পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ড, নিজেদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অংশ এবং সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

এর আগে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হলে ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে, যদিও পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে।

সেসময় পাকিস্তান দাবি করে, আকাশযুদ্ধে তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে ভারতীয় কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেন, যদিও ভূপাতিত বিমানের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলেননি।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, ‘পশ্চিমা ও রাশিয়ার ব্যয়বহুল ব্যবস্থার বিপরীতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বেশ ভালো সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা এসব বিমানকে একাধিক দেশের বিমান বাহিনীর জন্য আকর্ষণীয় বিকল্পে পরিণত করেছে।’

ভারতীয় বিমান বাহিনী ঐতিহ্যগতভাবে ফরাসি মিরেজ–২০০০ ও রুশ সুখোই–৩০ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২০২৫ সালের সংঘাতে তারা ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমানও ব্যবহার করে।

অপরদিকে পাকিস্তান ব্যবহার করে সদ্য আমদানি করা চীনা জে-১০সি ভিগোরাস ড্রাগন, জেএফ-১৭ থান্ডার ও যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সেসময় ৪২টি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ৭২টি ভারতীয় যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি হয়েছিল।

জেএফ-১৭ থান্ডার হালকা ওজনের, সব আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য বহুমাত্রিক এক যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি) যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান ও চীন এই যুদ্ধবিমান উন্নয়নে চুক্তি সই করে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে পাঞ্জাব প্রদেশের কামরায় পিএসিতে এটি তৈরির কাজ শুরু হয়।

এই প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক এয়ার কমোডর জানান, উৎপাদনের ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানে ও ৪২ শতাংশ চীনে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বিমানের সামনের ফিউজেলাজ ও উল্লম্ব লেজ তৈরি করি, আর চীন মধ্য ও পেছনের অংশ তৈরি করে। এতে রুশ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় এবং ব্রিটিশ নির্মাতা মার্টিন–বেকারের ইজেকশন সিট বসানো হয়। তবে পুরো বিমানের চূড়ান্ত সংযোজন পাকিস্তানেই করা হয়।’

তিনি জানান, ২০০৭ সালের মার্চে প্রথমবার জনসমক্ষে জেএফ-১৭ উন্মোচিত হয়। ব্লক–১ সংস্করণ ২০০৯ সালে বহরে যুক্ত হয় এবং সবচেয়ে উন্নত ব্লক–৩ সংস্করণ ২০২০ সালে পরিষেবায় আসে।

‘এর মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের পুরোনো বহরকে প্রতিস্থাপন করা। পরবর্তী এক দশকে এটি আমাদের বিমান বাহিনীর মূল শক্তিতে পরিণত হয়—এখন ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এই শ্রেণির’, যোগ করেন তিনি।

জেএফ-১৭–এর আগে পাকিস্তান প্রধানত ফরাসি নির্মাতা দাসোঁর মিরেজ–৩ ও মিরেজ–৫ এবং চীনা জে-৭ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

ব্লক–৩ সংস্করণ জেএফ-১৭–কে তথাকথিত ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের কাতারে নিয়ে গেছে। এতে আকাশ থেকে আকাশে ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের সক্ষমতা, উন্নত অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং দৃষ্টিসীমার বাইরে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা রয়েছে।

এর অ্যাভিওনিক্স ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতা চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান—যেমন: এফ-১৬ ও সুখোই-২৭—এর তুলনায় উন্নত, যেগুলো মূলত গতি ও ডগফাইটের জন্য নকশা করা হয়েছিল।

এইএসএ রাডার একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণ এবং দীর্ঘ দূরত্বে ভালো নজরদারি করতে পারে। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো এতে স্টেলথ সক্ষমতা নেই।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ভাষ্য, এই যুদ্ধবিমান মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় উচ্চমাত্রার কৌশলগত চলাচল করতে পারে এবং আগ্নেয়শক্তি, ক্ষিপ্রতা ও টিকে থাকার ক্ষমতার সমন্বয়ে এটি ‘যেকোনো বিমান বাহিনীর জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম’।

প্রথম দেশ হিসেবে জেএফ-১৭ কিনে নেয় মিয়ানমার। ২০১৫ সালে তারা অন্তত ১৬টি ব্লক–২ সংস্করণের বিমান অর্ডার দেয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭টি সরবরাহ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ক্রেতা হিসেবে নাইজেরিয়া ২০২১ সালে তাদের বিমান বাহিনীতে ৩টি জেএফ-১৭ যুক্ত করে।

এরপর আজারবাইজান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি যুদ্ধবিমান কেনার প্রাথমিক চুক্তি করে, যার মূল্য ১৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে ৫টি জেএফ-১৭ প্রদর্শন করে, এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তৃতীয় বিদেশি অপারেটর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

একই মাসে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা একটি ‘বন্ধু দেশের’ সঙ্গে জেএফ-১৭ বিক্রির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে ক্রেতার নাম প্রকাশ না করে এটিকে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

গত এক দশকে ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ জেএফ-১৭ কেনার বিষয়টি বিবেচনা করলেও সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

যদিও জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মূল ভরসা, তবে চীনের বিমান বাহিনী এই বিমান ব্যবহার করে না। তারা মূলত জে-১০, জে-২০ ও উন্নয়নাধীন জে-৩৫–এর ওপর নির্ভরশীল।

যুদ্ধবিমানটির সম্পূর্ণ সংযোজন যেহেতু কামরায় করা হয়, তাই জেএফ-১৭–এর প্রধান বিক্রেতা পাকিস্তানই এবং বিক্রয়োত্তর সেবাও তারাই দেয়।

বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো হলো পঞ্চম প্রজন্মের জেট—যেমন: যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ ও এফ-৩৫, চীনের জে-২০ ও জে-৩৫ ও রাশিয়ার সুখোই-৫৭। এসব বিমানে রয়েছে স্টেলথ প্রযুক্তি, যা আগের প্রজন্মের বিমানে নেই।

এর বিপরীতে জেএফ-১৭–এর ব্লক–৩ সংস্করণ ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের শ্রেণিভুক্ত। এই শ্রেণিতে রয়েছে সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজস ও চীনের জে-১০–এর মতো বিমান।

স্টেলথ না থাকলেও ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের বিমানে বিশেষ ধরনের আবরণ থাকে, যা রাডারে প্রতিফলন কমিয়ে দেয়—ফলে এগুলো শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

উদাহরণ হিসেবে, ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের কোনো জেট শত্রুপক্ষের রাডার এলাকায় প্রবেশ করলে সেটি শনাক্ত হতে পারে, তবে সেসময় ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবহার করে সংকেত ব্যাহত অথবা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ফিরে যাওয়ার সক্ষমতা থাকে।

অপরদিকে, পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলো তাদের নকশা ও অভ্যন্তরীণ অস্ত্র বহনের কারণে রাডারে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে।

সরকারি মূল্য প্রকাশ না হলেও ধারণা করা হয় প্রতিটি জেএফ-১৭–এর দাম ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার। তুলনায় রাফালের দাম ৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি, আর গ্রিপেনের দাম ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

ইসলামাবাদভিত্তিক আঞ্চলিক এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক (যিনি জেএফ-১৭–এর উন্নয়ন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন) বলেন, ‘এই বিমানের আকর্ষণের মূল কারণ হলো খরচের তুলনায় কার্যকারিতা, কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘জেএফ-১৭–এর আকর্ষণ শুধু শীর্ষ পারফরম্যান্সে নয়, বরং পুরো প্যাকেজে—কম দাম, অস্ত্র সংযোজনের নমনীয়তা, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং তুলনামূলকভাবে কম পশ্চিমা রাজনৈতিক শর্ত।’

‘এই অর্থে জেএফ-১৭ হলো একটি যথেষ্ট উৎকৃষ্ট মানের বহুমাত্রিক জেট, যা সহজলভ্যতার জন্য অপ্টিমাইজড। সীমিত বাজেটে আধুনিকায়ন করতে চাওয়া বিমান বাহিনীর জন্য এটি উপযোগী, তবে পাল্লা, অস্ত্র বহনক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনায় এটি জে-১০সি বা এফ-১৬ভি–এর মতো উচ্চস্তরের বিমানের সরাসরি বিকল্প নয়’, যোগ করেন তিনি।

আদিল সুলতান বলেন, ‘২০২৫ সালে ভারতীয় বিমানের বিরুদ্ধে জেএফ-১৭–এর পারফরম্যান্স এর সক্ষমতাকে স্পষ্ট করেছে।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আকাশযুদ্ধের ফলাফল শুধু বিমানের ওপর নয়, কে সেটি চালাচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করে।’

ভূমি ও আকাশভিত্তিক রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত মানবিক দক্ষতার সঙ্গে বিমানের সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানান তিনি।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান বিমান বাহিনী আবারও নজর কাড়ে—বিশেষ করে ৭ মে রাতে, যখন ভারতীয় বিমান পাকিস্তানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দাবি, চীনা নির্মিত জে-১০সি উড়িয়ে পাকিস্তানি স্কোয়াড্রন অন্তত ৬টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করে। শুরুতে ভারত ক্ষয়ক্ষতি অস্বীকার করলেও পরে ‘কিছু’ বিমান হারানোর কথা স্বীকার করে।

পাকিস্তান ও ভারতের এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবিদার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার পাকিস্তানি বিমানের পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেছেন—যা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।

যদিও ওই ভূপাতিতের ঘটনায় জেএফ-১৭ সরাসরি জড়িত ছিল না, তবে পাকিস্তান বিমান বাহিনী বলছে—এটি ভারতীয় বিমানের সঙ্গে সংঘাতে অংশ নেওয়া ফরমেশনের অংশ ছিল।

এর তিন দিন পর ১০ মে পাকিস্তানি আইএসপিআর দাবি করে—একটি জেএফ-১৭ দিয়ে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতে রুশ-নির্মিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত করা হয়েছে। ভারত এই দাবিও অস্বীকার করেছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক ওই বিশ্লেষক বলেন, মে মাসের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান জেএফ-১৭–কে যুদ্ধপরীক্ষিত ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বাজারজাত করছে—বিশেষ করে সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেটের দেশগুলোর কাছে।

তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘সম্ভাব্য সংগ্রহ’–সংক্রান্ত ঘোষণাগুলোকে সাবধানে দেখা উচিত।

শুধু ‘আগ্রহ প্রকাশ’ মানেই দ্রুত চুক্তি নয়। যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া সাধারণত অনুসন্ধানী আলোচনার পর চুক্তি ও সরবরাহে রূপ নিতে বছরের পর বছর সময় নেয় বলে জানান তিনি।

পাশাপাশি যোগ করেন, ‘ঋণের বিনিময়ে জেএফ-১৭ দেওয়া—এটা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মূল পরিকল্পনা নয়।’

অন্য পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসলামাবাদ তাদের বিমান বাহিনীর পারফরম্যান্সকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়ানো এবং নিজেকে একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেখছে।

জেএফ-১৭ প্রকল্পে যুক্ত ওই অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।’

তিনি বলেন, ‘খুব কম দেশই যুদ্ধবিমান তৈরি করে, আর বাজারের বড় অংশ পশ্চিমা নির্মাতাদের দখলে—যারা প্রায়ই নানা শর্ত জুড়ে দেয়। কিন্তু সবাই বৈচিত্র্য চায় এবং এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখতে চায় না—সেখানেই পাকিস্তানের সুযোগ।’

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে।’

এ ধরনের চুক্তি শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম বা বিমান বিক্রির বিষয় নয়। এটি জাতীয় পর্যায়ের সহযোগিতা ও কৌশলগত সমন্বয়ের প্রতিফলন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিমান হলো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার, যার কার্যকাল সাধারণত তিন থেকে চার দশক থাকে।’

‘বাংলাদেশ যদি এফ-১৭ বা সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তারা প্রশিক্ষণ ও বিক্রয়োত্তর সেবাসহ দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যাচ্ছে। তারা চীনা জে-১০–এর প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে—যার মানে কৌশলগতভাবে ভবিষ্যতে কার সঙ্গে তারা সমন্বয় করবে, সে সিদ্ধান্ত তারা নিয়ে ফেলেছে’, যোগ করেন তিনি।

Popular

More like this
Related

গবেষণায় পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইলেন তথ্য উপদেষ্টা

পূর্ব পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের বিভিন্ন আর্থসামাজিক ঘটনাবলি নিয়ে...

গ্রিনল্যান্ড না পেলে ইউরোপের ৮ দেশের ওপর আরও শুল্ক: ট্রাম্প

গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর...

মেসিও জানেন, আমি তার মতো হতে চাই না: ইয়ামাল

দুজনই বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়া থেকে উঠে এসে মূল...

মুন্সিগঞ্জে পুলিশের সামনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল: এসআই বরখাস্ত, আটক ৩

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় শেখ হাসিনার রায়ের প্রতিবাদে নিষিদ্ধ সংগঠন...