পাঁচটি তারা: ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের গল্প

Date:

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ব্রাজিলের চেয়ে সফল আর কোনো নাম নেই। ১৯৫৮ থেকে ২০০২— এই ৪৪ বছরে তারা পাঁচবার বিশ্বজয়ের যে মহাকাব্য লিখেছে, তার প্রতিটি অধ্যায় ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের এক একটি অনন্য দলিল। সেই পাঁচ শিরোপার নেপথ্য গল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে রোমাঞ্চকর সব তথ্য।

সেলেসাওদের দাপট আর সোনালী ট্রফির প্রেম— ফুটবল বিশ্বের চিরন্তন এক দৃশ্য। চলুন ফিরে দেখা যাক সাম্বার ছন্দে মোড়ানো পাঁচ ঐতিহাসিক জয়।

ব্রাজিলের পাঁচ শিরোপা:

১৯৫৮: সুইডেনের মাটিতে প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
১৯৬২: চিলির আসরে শিরোপা ধরে রাখা
১৯৭০: মেক্সিকোয় শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার
১৯৯৪: যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
২০০২: দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের আঙিনায় ‘পেন্টা’ জয়

পেলের সঙ্গে বিশ্বের পরিচয়

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের প্রথম শিরোপা জয়ের সাক্ষী। ফাইনালে পেলের জোড়া লক্ষ্যভেদে স্বাগতিক সুইডেনকে ৫-২ গোলে চূর্ণ করে বিশ্বজয়ের উল্লাসে মেতেছিল তারা। সেবার ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন এক আসরে রেকর্ড ১৩ গোল করে অবিশ্বাস্য নজির গড়লেও সব শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিলেন ১৭ বছরের এক ব্রাজিলিয়ান কিশোর— পেলে।

চোট নিয়ে সুইডেনে পৌঁছানো সেই কিশোরের বিশ্বমঞ্চে অভিষেক হতে হতে গড়ায় দলের তৃতীয় ম্যাচ পর্যন্ত। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় পায় ব্রাজিল। আর জয়সূচক গোলটি আসে পেলের পা থেকেই। মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি।

পেলের ক্ষুধা সেখানেই মেটেনি। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের কনিষ্ঠতম হ্যাটট্রিককারীর রেকর্ডটি এখনও নিজের দখলে রেখেছেন (১৭ বছর ২৪৪ দিন)। স্বপ্নের সেই দৌড় থামেনি ফাইনালেও। একমাত্র অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার অনন্য কীর্তিটিও গড়েন (১৭ বছর ২৪৯ দিন) তিনি।

টানা দুবার শিরোপা জয়ের শেষ অধ্যায়

চার বছর আগের কিশোর পেলে চিলিতে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে যখন পা রাখেন, তখন বিশ্বের সেরা ফুটবলারের তকমা তার গায়ে সাঁটানো। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এবার মাঠের ভেতরের পারফরম্যান্স দিয়ে নয়, সাইডলাইনে বসেই সতীর্থদের শিরোপা উঁচিয়ে ধরা দেখতে হয়েছিল তাকে।

মেক্সিকোর বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট দিয়ে দুর্দান্ত শুরু করেছিলেন পেলে। তবে চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে পরের ম্যাচেই তিনি ভয়াবহ চোটে পড়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান। তার অভাব পূরণ করতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ‘বাঁকা পায়ের জাদুকর’ গারিঞ্চা এবং তার যোগ্য সঙ্গী ভাভা। দুজনেই চারটি করে গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপা জয়ের পথে টেনে নিয়ে যান।

ফাইনালে সেই চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষেই শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু আমারিলদো, জিতো ও ভাভার নৈপুণ্যে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে তারা। এতে ইতালির পর ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় ও সবশেষ দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বজয়ের রেকর্ড গড়ে সেলেসাওরা।

ইতিহাসের সেরা ফুটবল দল?

১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই অন্য গ্রহের কিছু। মেক্সিকো বিশ্বকাপে তারা পা রেখেছিল বাছাইপর্বের ছয়টি ম্যাচের সবকটিতে জিতে। মূল আসরেও বজায় ছিল একই ধরনের আধিপত্য। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ জিতে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল তারা। ১৯৩০-এর দশকের পর আর কোনো দল বিশ্বমঞ্চে এমন পূর্ণ দাপট দেখাতে পারেনি।

কোচ মারিও জাগালোও গড়েন এক ইতিহাস। ব্রাজিলের হয়ে খেলোয়াড় (১৯৫৮ ও ১৯৬২) ও কোচ— দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েন। তৃতীয় শিরোপা জেতায় সেবারই চিরতরে ‘জুলে রিমে’ ট্রফিটি নিজেদের করে নেয় সেলেসাওরা।

ওই দলের প্রাণভোমরা ছিলেন জারজিনিয়ো, যিনি টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছিলেন। আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপজয়ী দলের আর কোনো সদস্যের এমন কৃতিত্ব নেই। তিনি ফিনিশিংয়ে আলো কাড়লেও পেলে ছিলেন সেই শৈল্পিক অর্কেস্ট্রার নেপথ্য কারিগর। পুরো আসরে তিনি মোট ২৮টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের জয়ে কার্লোস আলবার্তোর আইকনিক গোলটির কারিগরও ছিলেন পেলে। নয়টি নিখুঁত পাসের সমন্বয়ে আসা গোলটি যেন ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের কালজয়ী স্মারক। ওই বিশ্বকাপে তারা প্রতি ম্যাচে গড়ে ৫.২ বার করে ১০টি বা তার বেশি পাসের ‘ওপেন প্লে সিকোয়েন্স’ তৈরি করত।

পেনাল্টি শ্যুটআউটের স্নায়ুযুদ্ধ

সোনালী যুগের অবসানের পর দীর্ঘ ২৪ বছরের এক বিষাদময় খরা পার করতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অবসান ঘটে প্রতীক্ষার। খর্বকায় রোমারিও (৫ গোল) ও বেবেতোর (৩ গোল) কাঁধে চড়ে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছালেও, ইতালির ইস্পাতকঠিন রক্ষণের সামনে ১২০ মিনিট গোলশূন্য থাকতে হয়েছিল ব্রাজিলিয়ান আক্রমণভাগকে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তাই ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারিত হয় পেনাল্টি শ্যুটআউটে। ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিওর শটটি যখন ক্রসবারের ওপর দিয়ে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যায়, তখনই ৩-২ ব্যবধানে জিতে ব্রাজিলের চতুর্থ শিরোপা নিশ্চিত হয়।

এটি ব্রাজিলের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক স্কোয়াডগুলোর একটি ছিল না, আবার তাদের রক্ষণভাগও খুব একটা নড়বড়ে ছিল না। তবে তারা ছিল অসাধারণ কার্যকর। ৭ ম্যাচে মাত্র ১১টি গোল করেও তারা সেরার মুকুট উঁচিয়ে ধরে। অন্যদিকে, তাদের রক্ষণভাগ ছিল বেশ দুর্ভেদ্য। পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র তিনটি গোল হজম করেছিল।

রোনালদোর পুনরুত্থান ও ‘পেন্টা’ জয়

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে হট ফেভারিট ছিল ব্রাজিল। সবার নজর ছিল তরুণ রোনালদোর ওপর। কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের ঠিক আগে তাকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়া এবং নাটকীয়ভাবে আবার অন্তর্ভুক্ত করার রহস্য আজও অমীমাংসিত। টালমাটাল প্রস্তুতির মাশুল গুনতে হয়েছিল সেলেসাওদের। স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ট্রফি খুইয়েছিল তারা।

ওই ট্র্যাজেডি এবং প্রায় দুই বছর চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকা রোনালদো যখন এশিয়ার মাটিতে পা রাখেন, তখন অনেকেই তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিষাদময় স্মৃতি মোছার চ্যালেঞ্জ ছিল তার সামনে। আর ‘আর-নাইন’ ঠিক সেটিই করে দেখান, নিজের চেনা রূপে ফেরেন রাজকীয় ভঙ্গিতে।

পুরো আসরে ৮ গোল করে রোনালদো জেতেন গোল্ডেন বুট। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে তার জোড়া গোলেই ২-০ ব্যবধানের জয়ে পঞ্চম শিরোপা নিশ্চিত করে ব্রাজিল। রিভালদো ও রোনালদিনিয়োর সঙ্গে মিলে তার গড়া বিধ্বংসী আক্রমণভাগের সুবাদে দলটির জয় নিয়ে কখনোই যেন কোনো সংশয় ছিল না। অথচ ভয়াবহ চোটের কারণে বাছাইপর্বে একটি ম্যাচও খেলতে পারেননি রোনালদো।

Popular

More like this
Related

রাজধানীতে কখন কোথায় ঈদের জামাত

এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ব্যবস্থাপনায় জাতীয় ঈদগাহ...

যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র রপ্তানি করবে না সুইজারল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রে ইসরায়েলি অস্ত্র কারখানায় অগ্নিসংযোগ

নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের অস্ত্র রপ্তানি স্থগিতের...

পবিত্র ঈদুল ফিতর আগামীকাল

মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর...

বিশ্ব ইনডোর অ্যাথলেটিকস: মৌসুমের সেরা টাইমিং করেও ইমরানুরের বিদায়

পোল্যান্ডে চলমান বিশ্ব ইনডোর অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে এবারের মৌসুমে নিজের...