পরমাণু বোমা নিরাপত্তা দেয়, প্রমাণ করলো ইরান যুদ্ধ’

Date:

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের আজ ২৬তম দিন। 

শিগগির পঞ্চম সপ্তাহে পা দিতে যাওয়া এই সংঘাতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বা ইরানের নেতাদের পাশাপাশি উচ্চারিত হতে শোনা গেল উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের নামও।

কিন্তু এই যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়েও কীভাবে কিম এতে প্রাসঙ্গিক হলেন? আসুন জানা যাক বিষয়টি।

 

 

তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে আছে—এমন আশংকা থেকেই গত বছরের জুনে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। 

দেশ দুইটির মধ্যে ১২ দিনের এই যুদ্ধে পরে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেয়। ইরানের বড় বড় পরমাণু প্রকল্পে বাঙ্কার বাস্টার বোমা নিক্ষেপ করে ওয়াশিংটন।

এরপর আলোচনা সাপেক্ষে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল-ইরান।

সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের পরমাণু প্রকল্প ধ্বংস হয়েছে’।

 

পরবর্তীতে দেখা গেল, যতটা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করেছিলেন ট্রাম্প, তার চেয়েও ভালো অবস্থায় আছে ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পরমাণুকেন্দ্রগুলো।

অল্প সময়ের মধ্যে আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে তেহরান—এমন ঘোষণায় নড়েচড়ে বসেন নেতানিয়াহু-ট্রাম্প।

তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, পরমাণু অস্ত্র বানানোর কোনো চিন্তা তাদের নেই।

মূলত পরমাণু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ উদ্যোগে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল দেশটি।

তবে এসব যুক্তি কাজে আসেনি। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগে বাদ সাধতে আবারও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু হয়।

এবার প্রথম থেকেই ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরানে বিমান হামলা শুরু করে।

পাল্টা জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অবস্থানরত মার্কিন সেনা ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান।

দেখা গেল সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ইরাক—কেউই ইরানের হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।

অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় গোটা বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই জগাখিচুড়ী মার্কা পরিস্থিতিতে ‘আখেরে লাভ হয়েছে’ দুই বিশ্বনেতার। একজন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও অন্যজন উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন।

তবে আজকের লেখার বিষয়বস্তু পুতিন নন।

কিমের ব্যাপারে বিশ্বজনতার অভিমতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। নিজ দেশেও তিনি নন্দিত-নিন্দিত।

নিজ দলের কাউন্সিল নির্বাচনে ৯৯ শতাংশ ভোট কুড়িয়েও কারও কারও দৃষ্টিতে তিনি একজন স্বৈরশাসক।

কেউ বলেন, তিনি দেশপ্রেমিক—দেশের স্বার্থকে সব কিছু থেকে এগিয়ে রাখেন। কারও দাবি, তিনি খলনায়ক।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণ না করে সামরিক সক্ষমতায় সব অর্থ খরচ করছেন।

সম্প্রতি কিম জং উন মত দেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এটাই প্রমাণ করেছে যে তার দেশ পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে সঠিক কাজটিই করেছে।

উত্তর কোরিয়ার সংসদে (সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলি) দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনকে এক হাত নেন কিম। সিএনএনের প্রতিবেদনে এ বিষয়টির উল্লেখ আছে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা দাবি করেন, ওয়াশিংটন ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস ও আগ্রাসন চালাচ্ছে’।

তবে ইরানের নাম উল্লেখ করেননি কিম।

কিম জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ‘মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে’ পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার চেষ্টা করে। এতে কাজ না হওয়ায় ‘চাপ’ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন এই নেতা।

 

তবে এসব প্রস্তাব নাকচ করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ছিল দাবি করেন কিম।

তার মতে, পিয়ংইয়ং এখন পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত। এই অবস্থান থেকে সরে আসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
 

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে ‘শত্রু’ ইরান।

তাৎক্ষণিকভাবে এই ‘হুমকি’ দূর করতে হবে। অথচ এর কয়েক মাস আগেই একই ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়েছে।

ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগের কারণেই দেশটির বিরুদ্ধে হামলা হচ্ছে—এমনটাই দাবি করেন রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই খামখেয়ালিপূর্ণ অবস্থান ও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার ফলে উত্তর কোরিয়ার নেতৃবৃন্দের একটি বহুল প্রচারিত তত্ত্ব বৈধতা পেয়েছে।

 

‘যেসব দেশের পরমাণু অস্ত্র নেই, তারা মার্কিন সামরিক শক্তিমত্তার সামনে অসহায়। আর যাদের পরমাণু অস্ত্র আছে, তারা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যেকোনো সম্ভাব্য হামলার উদ্যোগ নিরুৎসাহিত করতে পারে।’

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কিমের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার খড়গ মাথায় নিয়েও পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ‘সঠিক’ ছিল।

কিম জানান, বিশ্ব এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির বীণার সুরে নাচছে। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা ও দেশকে নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায় হলো 

শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া।
 

গত ২৩ মার্চ উত্তর কোরিয়ার আইনসভায় দীর্ঘ বক্তব্য দেন কিম।

সেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন আচরণ অব্যাহত রাখা ও ওয়াশিংটনের হামলার আশংকা দূরে রাখতে পরমাণু অস্ত্রের সম্ভার আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেন তিনি।গত ২৪ মার্চ কিমের বক্তব্যের পুরো অংশ প্রকাশ পায়।

 

ওই বক্তব্যে কিম দাবি করেন, ২০১৯ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তিনি তার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত নেন। পরমাণু প্রকল্পের কার্যক্রম দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে নিতে শুরু করেন তিনি।

সে সময় থেকে ‘নিষেধাজ্ঞা সইতে’ সক্ষম, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলায় মন দেন কিম।

পাশাপাশি, অসংখ্য পারমাণবিক বোমা তৈরি করে শত্রুদের দূরে রাখাতেও নজর দেন তিনি।

‘আমি নিশ্চিত করছি, আমাদের দেশের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি নেই—বরং প্রয়োজনে আমরাই এখন অন্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করেছি। পরমাণু কেন্দ্রগুলোর নিখুঁত নির্মাণ এটা নিশ্চিত করেছে। এটি দেশের সব খাতের উন্নয়নকে পরিচালিত করছে। এর মধ্যে অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত,’ বলেন কিম।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সম্মান, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বিক বিজয় শুধু তখনই নিশ্চিত হবে, যখন আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারব। আমাদের সরকার নিজেদেরকে সমীহ জাগানিয়া পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করার যাবতীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।’

 

কিম জং উনের দাবিগুলো যে শুধু ‘ফাঁকা বুলি’ নয়, তার স্বপক্ষে অনেক প্রমাণ তিনি নিজেই উপস্থাপন করেন—নিয়মিত কোরীয় উপসাগরে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে।

বিশ্লেষকদের দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তর কোরিয়ার কাছে অন্তত ১০-২০টি সক্রিয় নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড আছে।

ভেনেজুয়েলা বা ইরান থেকে পিয়ংইয়ং অনেকটাই এগিয়ে। তাদের দাবি, তাদের কাছে কার্যকর পরমাণু অস্ত্র আছে এবং সেই অস্ত্রকে এমন কী যুক্তরাষ্ট্রে মূল ভূখণ্ডে পাঠানোর মতো ক্ষেপণাস্ত্র তাদের কাছে আছে।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। নতুন যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় দেশটি।

পরমাণু পরীক্ষার সময় কিমের পাশে ছিলেন বড় মেয়ে কিম জু আয়ে। তিনি ইঙ্গিত দেন, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু প্রকল্প শুধু স্থায়ীই নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এটি টিকে থাকবে।

 

সব মিলিয়ে এটা বলাই যায়—পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছাই আর নেই কিম জং উনের। তিনি এই অস্ত্র রাখার বৈধতা পেয়ে গেছেন এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রই যেন সে ব্যবস্থা করেছে।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, তিনি আবারও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পরমাণু আলোচনায় বসতে আগ্রহী।
তবে কিমের বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করেছে—আলোচনার টেবিলের আবহ এবার অনেকটাই ভিন্ন হবে।

পরমাণু নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় চালকের আসনে না থাকলেও সিটবেল্ট বাধা অসহায় যাত্রী হবেন না কিম জং। এটুকু নিশ্চিত বলা যায়।

Popular

More like this
Related

সিলেটে মোটরসাইকেলের জ্বালানি কিনতে পুলিশের ৩ শর্ত

সিলেট নগরীতে মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেল সংগ্রহে তিনটি শর্ত দিয়েছে...

২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের পেছনের গল্প

‘আল্লাহ ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের’ নামে ঢাকা আজ একটি বিধ্বস্ত...

পদ্মার ৮০ ফুট গভীরে বাসটি, বৈরী আবহাওয়ায় ব্যাহত উদ্ধার কাজ

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া...

জানালা দিয়ে ছেলেকে বের করে নিজে তলিয়ে যান জ্যোৎস্না

‘যখন বাস ফেরিতে উঠছিল, তখন হঠাৎ করে উল্টে যায়।...