পটুয়াখালীতে মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত কারিগররা

Date:

পটুয়াখালী সদর উপজেলার লোহালিয়া ও দুমকি উপজেলার দক্ষিণ পাঙ্গাশিয়া গ্রামে মুড়ি ভেজে
ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। সারা বছর মুড়ির চাহিদা থাকলেও রমজানের শুরুতে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের কাজের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

শুধু এই দুই গ্রামেই নয়, জেলার গলাচিপা, কলাপাড়া, পটুয়াখালী সদর উপজেলার কিসমত মৌকরন, মুরাদিয়া গ্রামের কয়েকশ পরিবার মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করে। মুড়ি ভাজার মূল ভূমিকায় থাকেন একজন নারী। তাকে পরিবারের অন্য সদস্যরা সহায়তা করেন।

দুমকি উপজেলার দক্ষিণ পাঙ্গাশিয়া গ্রামের সাহা বাড়ির চারটি পরিবার বংশপরম্পরায় মুড়ি ভাজার সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে অনীল সাহা (৭০) ও ববিতা রাণী সাহা (৫৫) দম্পতি মুড়ি ভাজার পেশায় যুক্ত হয়ে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছেন।

অনীল সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ছোটোবেলায় এই পেশায় যুক্ত হওয়ার সময় প্রতিমণ ধানের দাম ছিল মাত্র ৪০ টাকা। প্রতি সের মুড়ি বিক্রি করতাম আড়াই টাকা। বর্তমানে প্রতিমণ ধান কিনতে হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায়। আর প্রতি কেজি মুড়ি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করি।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন আমরা একশ কেজি চালের মুড়ি ভাজতে পারি। ভাজা মুড়ি পটুয়াখালী বা দুমকিতে সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করি। এছাড়া অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বাড়ি থেকে মুড়ি নিয়ে যান। বছরের সব সময়ই মুড়ির চাহিদা থাকে, তবে রমজানে চাহিদা একটু বেড়ে যায়।

অনীল সাহার স্ত্রী ববিতা রাণী সাহা বলেন, বসতবাড়ি ছাড়া আমাদের কোনো জমি নেই। এই মুড়ি বিক্রি করেই আমাদের তিন সন্তানের লেখাপড়াসহ পরিবারের যাবতীয় খরচ চলে।

একই বাড়ির ফটিক সাহা বলেন, মুড়ি ভাজা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। আমাদের সাহা বাড়ির অনেকেই মুড়ি বিক্রি করে সংসার চালান। আমরা ধানের মৌসুমে বাজার থেকে আমন ধান কিনে রাখি। সেই ধান থেকে চাল করে সারা বছর মুড়ি ভেজে বিক্রি করি।

এদিকে, সদর উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের সীমা রানী সাহা বলেন, মা’র কাছ থেকে মুড়ি ভাজার কাজ শিখেছি। তাই মুড়ি ভাজার কাজের সঙ্গে মিশে গেছি। মুড়ি ভাজতে আমার ভালো লাগে।

তিনি আরও বলেন, মুড়ি ভাজার জন্য মাটির তৈরি চার চোখের চুলা, হাড়ি-পাতিল, কুচি, ডালা, সাজিসহ প্রয়োজন কিছু বিশেষ সরঞ্জাম। প্রথমে মোটা ধানের চাল লবণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাটির পাত্রে ১৫ মিনিট রাখার পর ভাজা হয়। পাশাপাশি অন্য পাতিলে বালি গরম করতে হয়। ৫০ কেজি চালের জন্য প্রয়োজন এক কেজি লবণ। এরপর গরম বালিতে লবণ পানিতে ভেজানো চাল ঢেলে ১০–১৫ সেকেন্ডে মুড়ি তৈরি হয়।

মুড়ি কারিগরদের কাছ থেকে স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ীরা ৫০ কেজি মুড়ি ৪ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। স্থানীয় বাজারে ৫০ কেজি বস্তা বিক্রি হয় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৭৫০ টাকায়। খুচরা বাজারে মুড়ির দাম প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

পটুয়াখালী নিউ মার্কেটের খুচরা মুড়ি ব্যবসায়ী উজ্জ্বল সাহা ডেইলি স্টারকে বলেন, হাতে ভাজা মোটা মুড়ির জনপ্রিয়তা সবসময় ছিল। কিন্তু মেশিনে ভাজা মুড়ির কারণে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে কারিগরদের কম দামে মুড়ি বিক্রয় করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই এখনো হাতে ভাজা মুড়ি কিনেন। কারণ মেশিনের মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ বেশি।

মুড়ি তৈরির কারিগর পঙ্কজ চন্দ্র সাহা বলেন, ভোর ৫টা থেকে মুড়ি ভাজার কাজ শুরু হয়। চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। একদিনে কেউ ৫০ কেজি, কেউ আবার একশ কেজি চালের মুড়ি ভাজতে পারেন।

আরেক কারিগর সত্য সাহা বলেন, হাতে ভাজা মুড়িতে কোনো প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ করা হয় না। তাই আমাদের এলাকার মুড়ি সুস্বাদু ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

Popular

More like this
Related

ঝিনাইদহে পাম্পে তেল নিতে আসা ছাত্রনেতাকে পিটিয়ে হত্যা

শনিবার ঝিনাইদহ সদর এলাকায় পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেলের জন্য তেল...

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ২৯৪

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে...

কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলকে ২০ হাজারের বেশি বোমা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে...

ইবির শিক্ষক হত্যায় অভিযুক্ত ২ শিক্ষক ও ১ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী...