ডিজেলের অভাবে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা

Date:

শরীয়তপুরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে টানা দুই দিন বন্ধ ছিল জেলার সবগুলো ফিলিং স্টেশন। গতকাল শুক্রবার থেকে কিছু স্টেশনে তেল বিক্রি শুরু হলেও সরবরাহ ঘাটতিতে ভোগান্তি কাটেনি। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে পদ্মায় মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা।

পদ্মা নদীর তীরবর্তী নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার জেলেরা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, নৌকা ও ট্রলার চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় তারা নদীতে যেতে পারছেন না। যার জন্য নদীর তীরে অধিকাংশ জেলে অলস সময় পার করছেন। পদ্মার পাড়ে বাজারগুলোতে যেসব খুচরা ডিজেল বিক্রেতা রয়েছেন, তাদের অনেকের কাছেই ডিজেল নেই।

আজ শনিবার জেলা-উপজেলার একাধিক পাম্প মালিক ও ম্যানেজাররা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ না থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। শুক্রবার অল্প পরিমাণ তেল সরবরাহ পেলে ৬টির মধ্যে ৩টি ফিলিং স্টেশনে বিক্রি চালু হয়।

মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা, প্রাইভেট কারে ১ হাজার টাকা, গণপরিবহনে ৫ হাজার টাকা ও কৃষক-জেলেদের ১ থেকে ২ হাজার টাকার তেল বিক্রি শুরু করা হয় স্টেশনগুলোতে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে।

কেউ যেন তেল মজুত করতে না পারে সেজন্য খোলা বাজারে খুচরা তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে প্রশাসনের। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন জেলেদের সামান্য পরিমাণে তেল দিচ্ছেন। আর যেসব খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে তারা অনেকেই লিটারে ৫০ থেকে ৭০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। বাধ্য হয়ে জেলেদের কেউ কেউ অতিরিক্ত দামে স্বল্প পরিমাণে তেল কিনে মাছ ধরতে যাচ্ছেন।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুরের ৩৩ হাজার জেলে পদ্মায় মাছ ধরেন। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ১২ হাজার ছোট-বড় নৌকা-ট্রলার মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। যার মধ্যে ৬-৭ হাজার নৌকা নিয়মিত পদ্মায় মাছ ধরতে যায়। নৌকাগুলোতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ডিজেল কম পাচ্ছেন এসব জেলেরা।

শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কিছু জেলে মাছ আহরণে গেলেও অধিকাংশ নৌকা পদ্মা নদীর ডান তীরে নোঙর করে রাখা হয়েছে। নৌকাতে বসে মাঝিরা জাল বুনছেন, ছিঁড়ে যাওয়া জাল মেরামত করছেন। কেউ আবার নৌকা মেরামতের কাজ করছেন। 
এ সময় জেলেরা জানান, আগে তারা ৭-৮ ঘণ্টা নদীতে মাছ ধরলেও, জ্বালানি সংকটের কারণে এখন ২-৩ ঘণ্টার বেশি মাছ ধরতে পারছেন না। এমনকি তারা মাঝ নদীতেও যেতে পারছেন না।

পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় গত তিনদিন পদ্মায় মাছ ধরতে যেতে পারেননি গোসাইরহাট উপজেলার গরিবেরচর ইউনিয়নের জেলে আবু সুফিয়ান। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সকাল-সন্ধ্যা মিলিয়ে আমরা ৭-৮ ঘণ্টা মাছ ধরতাম। এর জন্য প্রতিদিন আমাদের ছোট নৌকায় ৭-৮ লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু এখন তেল পাচ্ছি না।’

‘এখন দোকানে তেল আনতে গেলে আমাদের সর্বোচ্চ ২-৩ লিটার তেল দিচ্ছে। এতটুক তেলে তো আর মাছ ধরা সম্ভব না। প্রতিদিন মাছ ধরে যে টাকা আয় হয়, সেই টাকায় বাজার-সদাই করে বাড়িতে নিয়ে যাই। কিন্তু এখন মাছ ধরতে না পারায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে,’ বলেন সুফিয়ান।

৪০ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরেন নড়িয়া উপজেলার চরমোহন এলাকার সিরাজুল ঢালী। এই মাছ ধরেই তার সংসার চলে। নদীতে এমনিতেই এখন মাছ কম পাওয়া যায়। তার উপর বাজারে গিয়ে তেল পাচ্ছেন না।

সিরাজুল বলেন, ‘যাদের কাছে তেল পাওয়া যায় তারা লিটারে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দামে তেল বিক্রি করছেন। আমার বড় নৌকায় প্রতিদিন ১৫ লিটার তেল লাগে কিন্তু বাজারে ৫-৬ লিটারের বেশি তেল দেয় না। আগে ৭-৮ ঘণ্টা মাছ ধরলেও, তেল না পাওয়ার কারণে এখন ২-৩ ঘণ্টার বেশি মাছ ধরতে পারছি না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের আগে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে যেতে না পারলেও নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া এখন তারা পদ্মায় মাছ ধরতে নামছেন। জেলেরা তাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকার ডিজেল স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। ছোট-বড় নৌকা ভেদে তাদের প্রতিদিন ৩ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত তেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত ২-৩ দিন ধরে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তেলের সংকট থাকায় জেলেরা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। এভাবে তেল না পেলে হয়তো ভবিষ্যতে জেলেদের মাছ আহরণের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।’

শরীয়তপুর সদর উপজেলার গ্লোরি পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার অজিত হালদার বলেন, ‘সব ভোক্তারা যেন তেল পায়, সেজন্য আমরা সীমিত পরিসরে তেল সরবরাহ করছি। তবে কিছু পরিমাণ তেল নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি ভিআইপিদের জন্য মজুত রাখতে হচ্ছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকায়, তেল সিন্ডিকেট প্রতিরোধের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করছি না। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে মাঝে মাঝে কৃষক ও জেলেদের ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার ডিজেল বিক্রি করছি।’

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কেউ যেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তেল মজুত করতে না পারে, সেটি বন্ধে স্টেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—অকটেন ও পেট্রোল যেন খুচরা বাজারে বিক্রি করা না হয়। কিন্তু ডিজেল নিয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’

‘তবে যদি কোনো জেলে তেল না পান, তাহলে তারা জেলে কার্ডের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় তেল নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে জেলেকে তেলের সঠিক ব্যবহারের প্রমাণ অবশ্যই দিতে হবে। কারণ আমরা চাই না কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হোক,’ বলেন জেলা প্রশাসক।

Popular

More like this
Related

নেত্রকোণায় মজুত করা ৩৫০০ লিটার ডিজেল জব্দ, জরিমানা

নেত্রকোণার সদর উপজেলার হাটখলা বাজারে অবৈধভাবে মজুত করা সাড়ে...

নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের দেশের...

সৌদি আরবের পাইপলাইনে দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন

হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন বর্তমানে পূর্ণ...

মধ্যপ্রাচ্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইরানকে উন্নত ড্রোন দিচ্ছে রাশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে ইতোমধ্যে ১০ বছর...