ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের নতুন ব্যাকরণ: উত্তম কুমার কি এখনো প্রাসঙ্গিক?

Date:

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস ২৪ জুলাই। একইসঙ্গে দিনটি আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের সামনে এক অদ্ভুত আয়না হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে প্রেম, বিচ্ছেদ, সেলিব্রিটি, আবেগ আর জনপরিসর সবকিছুই এক নতুন ব্যাকরণে লিখিত হচ্ছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’র পর আমরা যেন প্রবেশ করেছি এক নতুন উপন্যাসে—‘লাভ ইন দ্য টাইম অব নিউ মিডিয়া’।

ফেসবুক বা নিউ মিডিয়া এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এক ধরনের ডিজিটাল সমাজব্যবস্থা। এখানে হাসি-কান্না, রাগ-অনুরাগ, প্রেম-অভিমান সবকিছুই ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠে। জেন-জি প্রজন্মের কাছে সম্পর্ক মানে শুধু অনুভূতি নয়, বরং এক ধরনের এক্সপ্রেশনাল পারফরম্যান্স—স্টোরি, রিল, পোস্ট, রিঅ্যাকশন ও ভিউয়ের ভেতর দিয়ে তা বারবার পুনর্গঠিত হয়।

প্রেম এখানে ব্যক্তিগত থেকেও বেশি হয়ে ওঠে পাবলিক ইভেন্ট। এই পাবলিক ইভেন্টের ভেতরেই তৈরি হয় নতুন ধরনের নৈতিকতা—নিউ এথিকস। আগে যেখানে সম্পর্কের গোপনীয়তা ছিল মৌলিক শর্ত, এখন সেখানে দৃশ্যমানতাই সত্য। কে কাকে ভালোবাসছে, কে কাকে ছেড়ে যাচ্ছে, এগুলো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক বিচার্য বিষয়। সম্পর্ক ভাঙলেই শুরু হয় বিশ্লেষণ, স্ক্রিনশট, পক্ষ-বিপক্ষ এবং এক ধরনের ডিজিটাল ট্রায়াল।

আজকের এই বাস্তবতায় উত্তম-সুচিত্রা যেন এক ভিন্ন সময়ের নান্দনিক প্রতীক। তাদের প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা—সবকিছুই ছিল পর্দার ভাষায় আবৃত, সংযত, ইঙ্গিতপূর্ণ। উত্তম কুমারের মৃত্যুদিবসে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, সেই সাদা-কালো যুগে সম্পর্ক ছিল ধীর, গভীর ও অনেক বেশি ‘অদৃশ্য’। আর অদৃশ্য বলেই সেখানে কল্পনার জায়গা ছিল বিস্তৃত, শ্রদ্ধার জায়গা ছিল অটুট।

আজকের ডিজিটাল সমাজে সেই অদৃশ্যতার জায়গাটি প্রায় নেই। উত্তম-সুচিত্রার যুগে বিচ্ছেদও ছিল এক ধরনের নীরব শিল্প। আর আজকের নিউ মিডিয়ায় বিচ্ছেদ এক ধরনের ‘স্পেকটাকল’—যেখানে জনতা দর্শক থেকে বিচারকে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো সেলিব্রিটির সম্পর্ক ভাঙলেই যে সামাজিক মিডিয়া উৎসব শুরু হয়, তা দেখায় যে আমরা এখন আবেগকে অনুভব করার চেয়ে বিশ্লেষণ করতে বেশি আগ্রহী।

এই জায়গাতেই জেন-জি প্রজন্মের দ্বন্দ্ব আরও গভীর। তারা একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি খোলামেলা; অন্যদিকে একইসঙ্গে তারা সবচেয়ে বেশি এক্সপোজড, সবচেয়ে বেশি নজরদারির মধ্যে থাকা প্রজন্ম। সম্পর্কের রসায়ন এখানে আর নিষিদ্ধ ট্যাবু নয়, কিন্তু একইসঙ্গে তা আবার কনটেন্ট, ট্রেন্ড ও ডিজিটাল ভ্যালিডেশনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে সম্পর্কও আর কেবল ‘ভালোবাসা’ নয়, এক ধরনের ডিজিটাল অর্থনীতি। লাইক, কমেন্ট, ভিউ, ফলোয়ার—সবমিলিয়ে কে কতটা ‘মূল্যবান’ তা নির্ধারিত হচ্ছে।

প্রেম এখানে অনুভূতির চেয়ে বেশি এক ধরনের এক্সচেঞ্জ সিস্টেমে পরিণত হয়েছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি কাজ করছে দৃশ্যমানতা ও জনপ্রিয়তার চাপ।

উত্তম কুমারের কালজয়িতা বোঝা যায় তার কয়েকটি প্রতিনিধিত্বশীল চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে। যেমন: ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘নায়ক’, ‘চাওয়া পাওয়া’ বা ‘সাগরিকা’। যোগাযোগবিদ্যা ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের দৃষ্টিতে এসব চলচ্চিত্র শুধু কাহিনীর জন্য নয়, বরং ‘স্টার ইমেজ কনস্ট্রাকশন’-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

‘সপ্তপদী’তে রোমান্টিক সম্পর্ক ধর্ম, পরিচয় ও সামাজিক টেনশনের ভেতর দিয়ে ধীরে বিকশিত হয়, যেখানে প্রেম এক ধরনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার জায়গা তৈরি করে। ‘হারানো সুর’-এ সঙ্গীত ও স্মৃতির মাধ্যমে পরিচয় পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া দেখা যায়, তা আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল পরিচয় রাজনীতির বিপরীতে এক দীর্ঘস্থায়ী আবেগীয় আর্কাইভ নির্মাণ করে। আবার সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এ উত্তম নিজেই এক মিডিয়া টেক্সট হয়ে ওঠেন, যেখানে খ্যাতি, ইমেজ ও অন্তর্গত নিঃসঙ্গতার দ্বন্দ্ব আধুনিক সেলিব্রিটি কালচারের আগাম রূপরেখা তৈরি করে।

এই চলচ্চিত্রগুলো দেখায়, উত্তম কুমারের স্টারডম কেবল বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে ধীর ন্যারেটিভ, সংযত আবেগ ও নৈতিক কোড দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ তৈরি করতো। তাই আজকের অ্যালগরিদমিক, দ্রুতভোগ্য কনটেন্ট-সংস্কৃতিতে তাকে ‘অচল’ মনে হলেও, আসলে তিনি সেই মিডিয়া-ইকোসিস্টেমের প্রতিনিধি, যেখানে অর্থ তৈরি হতো স্ক্রল নয়, বরং স্থিরদৃষ্টির গভীরতায়।

যোগাযোগবিদ্যা ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের দৃষ্টিতে উত্তম কুমারকে ‘অচল’ বলা এক অর্থে সময়ের পরিবর্তিত মিডিয়া-ইকোলজির প্রতিফলন। কারণ, তিনি যে ইমেজ-রেজিমে কাজ করেছেন, তা ছিল ক্লাসিক্যাল সিনেমা যুগের, যেখানে স্টার ইমেজ তৈরি হতো ধীর গতির ন্যারেটিভ, সীমিত মিডিয়া এক্সপোজার এবং নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরের ভেতরে।

আজকের প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজমে সেই স্টারডম আর টিকে নেই। এখন সেলিব্রিটি মানে রিয়েল-টাইম পারফরম্যান্স, ইনফ্লুয়েন্সার ইকোনমি, আর অ্যালগরিদমিক দৃশ্যমানতা। এই অর্থে উত্তম কুমার ‘অচল’। কারণ, তিনি অ্যালগরিদম-নির্ভর নন, বরং ন্যারেটিভ-নির্ভর এক যুগের নির্মাণ।

কিন্তু, একইসঙ্গে তিনি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, ফিল্ম স্টাডিজে স্টার টেক্সট কেবল সমকালীন জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি, জাতিগত কল্পনা ও আবেগীয় আর্কাইভের অংশ হয়ে থাকে। উত্তম কুমারের ইমেজ একটি স্থির ডিজিটাল প্রোফাইল নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক প্রতীক, যেখানে ‘নায়কত্ব’ কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নয়, বরং মধ্যবিত্ত নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও রোমান্টিক সংযমের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তাকে ‘অচল’ বলা মানে আসলে একটি নির্দিষ্ট মিডিয়া-টেম্পোরালিটির বাইরে থাকা এক নান্দনিক কাঠামোকে ভুল বোঝা।

যোগাযোগবিদ্যার তত্ত্বের ভাষায় বলা যায়, উত্তম কুমার যে ধরনের ‘ইমোশনাল সিগনিফিকেশন’ তৈরি করেছিলেন, তা আজকের মিম-কালচার বা ফাস্ট কনটেন্ট ইকোসিস্টেমে দ্রুত ভেঙে পড়া অর্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ইমেজ ভোগের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আবেগীয় স্থায়িত্বের জন্য নির্মিত। তাই ডিজিটাল যুগে তাকে অচল মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি একটি বিকল্প মিডিয়া এথিকসের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে দৃশ্যমানতা নয়, বরং অর্থের গভীরতা ও নীরবতার শক্তিই স্টারডমের ভিত্তি।

উত্তম কুমার ছিলেন এক ভিন্ন সময়ের নায়ক, যেখানে নায়কত্ব মানে ছিল নৈতিকতা, সংযম ও এক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব। তার চোখের ভেতরের আবেগও ছিল নিয়ন্ত্রিত, পরিশীলিত। আজকের ডিজিটাল নায়ক-নায়িকারা আবার একইসঙ্গে দৃশ্যমান ও ভঙ্গুর। তাদের জীবন লাইভ, কিন্তু তাদের নিঃসঙ্গতাও লাইভ-ই।

আজ তাই উত্তম কুমারের মৃত্যুদিবসে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা শুধু একজন মহানায়ককে স্মরণ করছি না; স্মরণ করছি এক হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক-সংস্কৃতিকে। যেখানে ভালোবাসা মানে ছিল দায়বোধ, বিচ্ছেদ মানে ছিল নীরবতা, আর স্মৃতি মানে ছিল সম্মান।

আজকের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব নিউ মিডিয়া’য় সেই নীরবতার জায়গা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে না? এই প্রশ্নের ভেতরেই যেন ফিরে আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত মুহূর্ত—যখন খ্যাতির চূড়ায় দাঁড়িয়েও উত্তম কুমার নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে চিনে ফেলেন, আর শোনা যায় সেই উচ্চাভিলাষী, তীব্র উচ্চারণ ‘আই উইল গো টু দি টপ, দি টপ, দি টপ’। এই এক লাইনে অরিন্দম মুখার্জীর স্বপ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে আধুনিক সেলিব্রিটি সংস্কৃতির সারকথাও।

গুরুর সতর্কতা উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক সাফল্যের শিখরে ওঠার যে তাড়না, তা আজ আর কেবল চলচ্চিত্রের কাহিনী নয়; বরং নিউ মিডিয়া যুগে প্রত্যেক ইনফ্লুয়েন্সার, প্রতিটি ইউজার প্রোফাইলের নীরব প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই ‘টপ’-এ পৌঁছে যাওয়ার পর যে শূন্যতা, যে একাকীত্ব, যে আত্মসংঘাত তা-ই এই সংলাপকে কালজয়ী করে তোলে। আর আজকের ডিজিটাল দৃশ্যমানতার রাজনীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজ আমরা তাই দেখি কাউকে ‘টপ’ করে ঝরেও যেতে!

আজ আমাদের ‘উত্তম’ নেই বলে নিউ মিডিয়া ও নিউ জেনারেশনের ‘অধম হইবার এত বাসনা’! তবু ইতিহাসের পর্দা পুরোপুরি নামেনি। উত্তম-সুচিত্রার ধীর আলোয় গড়া প্রেম, সংযমে নির্মিত আবেগ, আর মানবিক সম্পর্কের যে নীরব ব্যাকরণ ছিল, তা হয়তো এখন আর স্ক্রিনে দেখা যায় না, কিন্তু ডিজিটাল কোলাহলের ফাঁকে ফাঁকে তার প্রতিধ্বনি এখনো শোনা যায়। সেই প্রতিধ্বনিই মনে করিয়ে দেয়, দৃশ্যমানতার যুগ শেষ কথা নয়, অনুভবের নীরবতাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

 

রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
[email protected]

Popular

More like this
Related

দেশের প্রথম স্বল্পমেয়াদি সুকুক বন্ড কিনতে লক্ষ্যমাত্রার ১০ গুণ বেশি টাকার বিড

দেশের ইতিহাসের প্রথম স্বল্পমেয়াদি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ বন্ড ‘সুকুক’ কেনার...

হলে হলে ছুটছেন ঈদের সিনেমার তারকারা

ঈদের প্রেক্ষাগৃহে এখন শুধু কেবল নয়, একেকটি হলে যেন...

কুষ্টিয়ায় বাউল শফি মণ্ডলের বাড়িতে পুলিশি পাহারা

নিরাপত্তা শঙ্কায় বাউল শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন...