মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশব্যাপী জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন জ্বালানি আমদানির বিকল্প ও বহুমুখী উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা ছাড়াই পরিশোধিত জ্বালানি কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় বা অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়েছে। একইসঙ্গে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করতে এশিয়া, আফ্রিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ মার্চ ওয়াশিংটনকে একটি চিঠি পাঠায় ঢাকা। সেখানে রাশিয়া থেকে ছয় লাখ টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির অনুমতি অথবা বিকল্প হিসেবে অন্তত দুই মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছি। এখন আমরা তাদের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
জ্বালানি সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কর্মকর্তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি। বিশেষ করে, এই জ্বালানি সরাসরি রাশিয়া থেকে আসবে নাকি তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে আনা হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এরইমধ্যে, বাংলাদেশ সরকার তার আঞ্চলিক অংশীদারদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান একটি চুক্তির অধীনে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভারত প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগে বাংলাদেশ মাত্র পাঁচ হাজার টনের মতো ডিজেল পেয়েছিল।
পরে মন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ে যোগাযোগের ফলে আরও কিছু বাড়তি চালান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ‘ভারত-বাংলাদেশ পাইপলাইন’—এর মাধ্যমে পাঁচ হাজার টনের তিনটি চালান এবং সমুদ্রপথে সাত হাজার টনের একটি চালান পেয়েছে। এর ফলে ভারত থেকে মোট ডিজেল আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার টনে।
এদিকে, ইন্দোনেশিয়া থেকে আরও দুটি চালান আসার কথা রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে প্রায় ছয় হাজার টন করে জ্বালানি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আমদানির উৎস বহুমুখী করার অংশ হিসেবে সরকার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে যোগাযোগ করছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমরা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি; এরইমধ্যে অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে দুটি এলএনজি চালান আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।’
কর্তৃপক্ষ ইরানের সঙ্গেও জাহাজ চলাচলের সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়ে যোগাযোগ করেছে, তবে লজিস্টিক (পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত) এবং নিরাপত্তাজনিত কিছু জটিলতা রয়ে গেছে।
মুখপাত্র মনির হোসেন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা নেই এমন জাহাজগুলো সেখানে বাধার মুখে পড়তে পারে।’
জানা গেছে, ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজগুলোকে ওই প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে, তবে ঢাকা এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তার অপেক্ষায় আছে।
কর্মকর্তারা জানান, তারা বেশ কিছু বিকল্প পথ বা উপায় যাচাই করে দেখেছেন, কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা সাশ্রয়ী বলে মনে হয়নি।
একটি প্রস্তাবে সৌদি আরবের ইয়ানবু পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি আনার কথা বলা হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত বন্দর মাশুল, ট্রানজিট ফি এবং হ্যান্ডলিং খরচের কারণে জ্বালানির সামগ্রিক আমদানি খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
মুখপাত্র আরও যোগ করেন, ‘ক্রয়-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হতে হবে।’
নতুন সরবরাহকারী খোঁজা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দামের পাশাপাশি কিছু প্রচলিত রপ্তানিকারক দেশ অতিরিক্ত সারচার্জ বা মাশুল বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান বিভিন্ন অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ বর্তমানে পর্যাপ্ত রয়েছে।
গতকালের একটি এবং আগামী ৩ এপ্রিলের অন্য একটি চালানের মাধ্যমে মোট ৫৪ হাজার ৬০০ টন ডিজেল দেশে আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে এপ্রিলেই ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে আরও সাত হাজার টন ডিজেল পাওয়ার কথা রয়েছে।
মালয়েশিয়ান সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ডিজেল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার ফলে এপ্রিল মাসে মোট আমদানির পরিমাণ এক লাখ টনের কিছু বেশি হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমানে এক দশমিক ৩৭ লাখ টন ডিজেলের মজুদ রয়েছে, যা আপাতত সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মে ও জুন মাসের সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন হবে তা এখনই বলা কঠিন।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, সরকার আপাতত নিকট ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জ্বালানির বণ্টন নিয়ন্ত্রণ
সরকার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা রোধ এবং সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ সিস্টেম চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। এই প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় প্রতিটি নিবন্ধিত যানবাহনকে একটি কিউআর কোড দেওয়া হবে, যা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কেনা যাবে।
একবার জ্বালানি সংগ্রহের পর পরবর্তী পর্যায় শুরু হওয়ার আগে ওই একই যানবাহন যেন বারবার জ্বালানি কিনতে না পারে, সিস্টেমটি তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে দেবে।
গত কয়েক সপ্তাহে অকটেনের ব্যবহার অনেক বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ মোটরসাইকেলকেও এই পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা ভাবছে। এই সিস্টেম একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজ করবে, যেখানে যানের নিবন্ধনের তথ্য, কেনার সময় এবং জ্বালানির পরিমাণ রেকর্ড করা হবে, যেন কর্তৃপক্ষ আরও নিবিড়ভাবে বণ্টন তদারকি করতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে এই পাসগুলো সম্ভবত কেন্দ্রীয়ভাবে ইস্যু করা হবে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোর মাধ্যমে গাড়িচালকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে বর্তমান সেচ মৌসুমের কথা বিবেচনায় রেখে।
কৃষক যেন পর্যাপ্ত ডিজেল পান, তা নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের তৈরি করা তালিকার মাধ্যমে ডিজেল বণ্টন সমন্বয় করা হচ্ছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘সেচ কাজে ডিজেল সংকটের কারণে সমস্যা হচ্ছে— এখন পর্যন্ত কোনো জেলা প্রশাসন থেকে আমরা এমন কোনো অভিযোগ পাইনি।’
তিনি আরও জানান, এর পাশাপাশি সরকার কিছু সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে, যার মধ্যে রয়েছে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, হোম অফিস এবং অনলাইন ক্লাস চালুর মতো বিষয়গুলো।
বৈশ্বিক প্রভাব
নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। কোনো কোনো দেশে এই বৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশেরও বেশি।
এর পাশাপাশি, ফিলিপাইন এরইমধ্যে জ্বালানি সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং কিউবায় জ্বালানির মজুত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে।
সেই তুলনায় বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এখনো অনেকটা স্থিতিশীল রয়েছে বলে দাবি করছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই হলো ডিজেল, যার সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
তারা আরও জানায়, বর্তমানে মূল দুশ্চিন্তার বিষয় হলো অকটেন সংগ্রহ এবং এর বণ্টন ব্যবস্থা নিয়ে, যদিও মোট জ্বালানি চাহিদায় অকটেনের পরিমাণ মাত্র ৬ শতাংশের সামান্য বেশি।