জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মধু আহরণে মৌয়ালরা

Date:

সুন্দরবনে এখন ফুল ফোটার মৌসুম। খলিসা, গরান, কেওড়াসহ নানা গাছে শোভা পাচ্ছে রঙের ছটা। আর ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে মৌমাছিরা।

এরই মধ্যে আজ ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুন্দরবনে শুরু হচ্ছে মধু আহরণ মৌসুম। সরকারি অনুমতি নিয়ে আগামী দুই মাসের জন্য বনে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন মৌয়ালেরা। তবে মৌসুম শুরুর আগে বনদস্যুদের উৎপাত, অবৈধভাবে আগেভাগে মধু আহরণ এবং নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বড় উদ্বেগে রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে সুন্দরবনে খলিসা ও গরান ফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। এরপর আসে কেওড়া ফুলের মধু। এর মধ্যে সবচেয়ে দামি খলিসা ফুলের মধু। চলতি বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল (প্রতি কুইন্টালে ১০০ কেজি) মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশ কিছুটা বেশি। গত বছর বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে মৌয়ালেরা ১ হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।

সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকেই সবচেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করা হয়। আবহাওয়া ও বনের পরিবেশ অনুকূলে থাকলে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই রেঞ্জ থেকে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের আশা করছে বন বিভাগ। গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে এই রেঞ্জ এলাকা থেকে বৈধ পাস নেওয়া ১ হাজার ৭০৯ জন মৌয়াল ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টাল মধু ও ২৭৫ দশমিক ৫ কুইন্টাল মোম আহরণ করেছিলেন।

তবে সুন্দরবন থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পাওয়া নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে বিস্তর। কারণ, বৈধ পাসের আগেই চোরাকারবারিরা বনে ঢুকে অপরিণত চাক কেটে মধু নিয়ে যায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন বৈধ পাস নিয়ে বনে যাওয়া মৌয়ালেরা। খুলনার কয়রা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৌয়াল খোকন মণ্ডল বলেন, ‘একটি পরিপূর্ণ মধুর চাক থেকে কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাত কেজি মধু পাওয়া যায়। কিন্তু চোরা মধু আহরণকারীরা আগেভাগেই চাক কেটে নেওয়ায় অনেক সময় চাক থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম মধু মেলে।’হানি

জীবনের ঝুঁকি

প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক মৌয়াল প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মধু আহরণ করতে বনে ঢোকেন। সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় সারা দেশেই এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে এই মধু সংগ্রহের পেছনে পদে পদে রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। বাঘ, বিষধর সাপসহ নানা বন্য প্রাণীর আক্রমণের ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বনদস্যুদের আতঙ্ক।

শ্যামনগর উপজেলার গাউরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মৌয়াল দলনেতা আবদুর রাজ্জাক এবারও ১২ জনের একটি দল নিয়ে বনে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দস্যুদের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তিনি শঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘মুক্তিপণের দাবিতে কয়েক দিন আগেও আমাদের এলাকার এক জেলেকে বনদস্যুরা অপহরণ করেছে। সুন্দরবনে প্রবেশের আগেই বনদস্যুদের চাহিদামতো টাকা দিয়ে অনেক মৌয়ালকে বনে ঢুকতে হচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মৌয়াল জানান, ডাকাত দলের অত্যাচার বেড়ে যাওয়ায় অনেক মৌয়াল এবার মধু আনতে যাবেন না। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে একটি ডাকাত দল আমাদের কাছে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছে। এভাবে তিনবার ডাকাতদের টাকা দিতে হবে। এ কারণে এবার অনেকেই সুন্দরবনে যাবেন না।’

‘মধু খোঁজা তো বাঘ খোঁজা’—কথাটি বলছিলেন ‘টারজান’ নামের এক মৌয়াল। টারজান মূলত তার ছদ্মনাম। ক্ষিপ্রগতিতে বনের মধ্যে হাঁটা এবং কুমিরের ভয় উপেক্ষা করে অনায়াসে বড় নদী-খাল সাঁতরে পার হওয়ার কারণে দলের সঙ্গীরা তাকে এই নাম দিয়েছেন। তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়নের কুমখালী গ্রামে। এবার ছয়জনের একটি দল নিয়ে বনে যাচ্ছেন তিনি।

টারজান জানান, কখনো কখনো দিনের পর দিন হাঁটার পরও মৌচাক খুঁজে পাওয়া যায় না। বনের মধ্যে হাঁটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ বাঘের ভয় থাকে। এর মধ্যেই মাইলের পর মাইল বনের গহিনে হাঁটতে হয় মৌয়ালদের।

অভিজ্ঞ এই মৌয়াল বলেন, ‘ঘন জঙ্গলে মৌচাক খুঁজে পাওয়ার জন্য অভিজ্ঞ চোখ ও কান দরকার। মৌয়ালেরা মৌমাছির শব্দ শুনেও চাক খুঁজে বের করতে পারেন। সুন্দরবনের তিন ধরনের মৌচাকের মধ্যে “শিলা মৌমাছি”র চাক থেকে সবচেয়ে বেশি মধু পাওয়া যায়।’ এই জাতের মৌমাছি গভীর বনের ভেতরে মাটির সমান্তরাল গাছে চাক তৈরি করে। ভরা জোয়ারের সময় এসব চাক পানি থেকে মাত্র কয়েক ফুট ওপরে থাকে।

একাধিক মৌয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাক খুঁজে পাওয়ার পর মৌয়ালেরা গামছা দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে নেন। এরপর হেঁতালের পাতা কেটে আঁটি বেঁধে তাতে আগুন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। ধোঁয়ার কারণে মৌমাছি চাক ছেড়ে বেরিয়ে গেলে মধু সংগ্রহ শুরু হয়।

মৌয়ালেরা জানান, এই কাজের জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। রানি মৌমাছি ও লার্ভার কোনো ক্ষতি না করে চাক কেটে চিপে মধু বের করা হয়। সঠিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করলে একটি চাক থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। মধুর পাশাপাশি কাটা চাক থেকে মোম তৈরি হয়। এত ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করলেও তা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন মৌয়ালেরা।

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৪৩৭টি পাসের বিপরীতে মোট ২ হাজার ৮৫৮ জন মৌয়াল বৈধভাবে সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। বিগত দশ বছরের মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৫ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়।

বন বিভাগ জানিয়েছে, ১৪ দিনে একজন মৌয়াল সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময়ের বেশি বনে অবস্থান করা যাবে না।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনেই মধু সংগ্রহ করতে হবে। এ বছর উদ্বোধনী আয়োজনকে আরও বড় পরিসরে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

Popular

More like this
Related

আইএসও ৯০০১:২০১৫ সনদ অর্জন করলো ‘এক্সপার্ট’

দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আজওয়া টেকের নিজস্ব ব্র্যান্ড এক্সপার্ট গুণমান...

‘বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে এত উচ্ছ্বাস-আনন্দ খুব ভালো লাগছে’

বাংলাদেশের কিংবদন্তী লেখক হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসের গল্প নিয়ে নির্মিত...

ক্রিমিয়ায় রুশ সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ৩০

ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপের আকাশে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি এএন-২৬...

জুন পর্যন্ত ইতালির দায়িত্বেই থাকছেন বুফন-গাত্তুসো

টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট পেতে ব্যর্থ হয়েছে ইতালি।...