যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা যে যুদ্ধে রুপ নিতে পারে সে আশঙ্কা আগেই করেছিল ইরান। যুদ্ধ প্রস্তুতির সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে যেসব কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে খামেনি সরকার তা উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।
যোগ্য উত্তরসূরি, নেতৃত্ব নির্ধারণসহ সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে এসব প্রতিবেদনে। একইসঙ্গে ইরানের হাতে সম্ভাব্য বিকল্প কী আছে—সে বিষয়েও মতামত জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন ৮৬ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। খুব সহজে তা ছেড়ে দেবেন বা অবসান ঘটতে দেবেন—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
উত্তরসূরি
রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ধারণা খামেনি মারা গেলে, তার উত্তরসূরি হতে পারেন দেশটির বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো কর্মকর্তা।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বার্তাসংস্থা এপিকে বলেন, ‘খামেনি নিহত হলে বিকল্প পরিকল্পনা আছে ইরানের। একক উত্তরসূরি মনোনয়নের বদলে ছোট কমিটির হাতে ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।’
তার মতে, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে শীর্ষ ২০ নেতাকে হারানোর পর নেতৃত্ব রক্ষায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন খামেনি। গত আট মাস ধরে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও জোরদার করেছেন।
নিজের উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নামও ঠিক করেছেন খামেনি। যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘খামেনি যুদ্ধ ও উত্তরাধিকার—দুই পরিস্থিতির জন্যই রাষ্ট্রকে প্রস্তুত করেছেন।’
রাষ্ট্রকাঠামো
ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে সাজিয়েছেন খামেনি।
সামরিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পদে চার স্তরের উত্তরাধিকার কাঠামো নির্ধারণ করেছেন।
শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে বাঁচানোসহ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছেন শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানিসহ ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগীদের।
যোগ্য উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিজ নিজ বিকল্পের তালিকাও তৈরি করতে বলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ এই নেতা।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বা নিহত হলে যেন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সে ক্ষমতাও একটি ঘনিষ্ঠ বলয়ের কাছে দিয়ে রেখেছেন খামেনি।
নতুন নেতৃত্ব
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইতোমধ্যে নেতৃত্বের ভার অনেকটাই তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানির হাতে তুলে দিয়েছেন।
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি ইরানের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার ও বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।
ইরানের ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিপ্লবী গার্ডের সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকদের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সম্প্রতি কঠোরভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নেতৃত্ব দেন লারিজানি।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্যত লারিজানিই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বলেও জানান তারা। তারা বলেন, যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনাও লারিজানির হাতে।
‘ইরানের ডেলসি’
ভেনেজুয়েলায় উদাহরণ সামনে রেখে ‘ইরানের ডেলসি’ কে হতে পারেন—তা নিয়েও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা করেছেন খামেনি।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলে কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে সে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন লারিজানি। এরপরই পার্লামেন্ট স্পিকার ও সাবেক গার্ড কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিশেষজ্ঞ আলি ভাইজ বলেন, বিকল্প পরিকল্পনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ফল অনিশ্চিত। খামেনি এখন কম দৃশ্যমান, বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তিনি এখনো পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোহাম্মদ ইসলামি তুরস্কের গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে। কোন অবস্থায় থাকবে, আমি বলতে পারছি না, তবে তারা পিছু হটবে না। এমনকি যদি তাদের পুরো অঞ্চল জ্বালিয়ে দিতে হয়, তারা তা করবে।’