গত আড়াই বছরে ইসরায়েলের সরাসরি ও গুপ্ত হামলায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বেশিরভাগই নিহত হয়েছেন। স্বভাবতই, সংগঠনে দেখা দিয়েছে চরম নেতৃত্ব সংকট। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে এসে নতুন নেতার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে হামাস।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ফিলিস্তিনি সংগঠনটি নতুন নেতা বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। দলের দুই জনপ্রিয় ও শীর্ষ নেতার মধ্যেই মূলত পদটি নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে।
কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দলটি ‘সূরা কাউন্সিল’ গঠন করেছে। এই কাউন্সিলটি মূলত দলের উপদেষ্টা পর্ষদ হিসেবে কাজ করে। ধর্মীয় নেতারা এই পর্ষদের সদস্য হন। পাশাপাশি, দলের রাজনৈতিক ব্যুরো গঠনও চূড়ান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালায় হামাস। ওই হামলায় প্রায় এক হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং জিম্মি হন ২৫০ ব্যক্তি।
ওই ঘটনার পর সেদিনই হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার অঙ্গীকার করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বাকিটা ইতিহাস। পরবর্তী দুই বছর চার মাসে একের পর এক নিহত হন হামাসের।
বলা যায়, ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে এক অর্থে নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানায় সই দিয়েছিলেন হামাসের নেতারা।
জনসম্মুখে কথা বলার অনুমতি না থাকায় হামাস কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘তিন অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ নির্বাচন শেষ করেছে হামাস। এখন সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধান বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।’
তিনি আরও জানান, দলের নেতা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন খালেদ মেশাল ও খলিল আল-হাইয়া।
হামাসের সাবেক নেতাদের প্রয়াণের পর এই দুই নেতার নাম নিয়মিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঠাঁই পেয়েছে।
হামাসের অপর এক সূত্র এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চালু হওয়া হামাস-ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গাজায় সহিংসতা বন্ধ হয়নি। প্রায় প্রতিদিনই হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তথাকথিত ওই যুদ্ধবিরতি শুরুর পর অন্তত ৬০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
হামাস-ইসরায়েল এসব ঘটনার জন্য একে অপরকে দায় দিয়ে এসেছে।
হামাসের তিন শাখার প্রতিনিধিরা শুরা কাউন্সিলের সদস্যদের চার বছরের মেয়াদে নির্বাচন করেন। ওই তিন শাখা হলো গাজা উপত্যকা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও দলটির বাহ্যিক নেতৃত্ব।
ইসরায়েলি কারাগারে আটক হামাসকর্মীরাও এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
কাউন্সিল নির্বাচিত হওয়ার পর তারা রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্যদের বেছে নেয়। তারপর ব্যুরোর সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতাকে বেছে নেন।
মূলত হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর নেতাই বহির্বিশ্বের কাছে হামাসের প্রতিনিধিত্ব করেন। সর্বশেষ এই পদে ছিলেন প্রয়াত নেতা ইসমাইল হানিয়া।
হামাসের এক সূত্র জানান, নতুন নেতা অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে থাকবেন। তার মেয়াদ হবে মাত্র এক বছর।
তিনি জানান, হাজারো হামাস সদস্য কাউন্সিল ও রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্যদের বেছে নিতে ভোট দেন। তবে কীভাবে ভোট নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করা ও নেতৃত্বশূন্যতা পরিপূরণ করা।’
বিশ্লেষকদের মত, হামাসের নতুন নেতা এক উভয়সংকটে পড়তে যাচ্ছেন। একদিকে ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে আসা ‘নিরস্ত্রীকরণের’ চাপ আর অপরদিকে দলটি সশস্ত্র অংশের কাছ থেকে আসা বিরোধিতা। উল্লেখ্য, এখনো গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে হামাসের সামরিক অংশটি।
আর অপর দিকে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল দ্বিতীয় ধাপে হামাসের সদস্যরা অস্ত্র ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ করবেন।
হামাস জানিয়েছে, তারা সুনির্দিষ্ট কিছু শর্তে গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্রসমর্পণ করতে রাজি আছে।
মিশাল ও হাইয়া উভয়ই হামাসের অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে বিবেচিত।
হাইয়া (৬৫) গাজার বাসিন্দা। তিনি যুদ্ধবিরতি আলোচনায় হামাসের প্রতিনিধিদলের নেতার ভূমিকা পালন করছেন। ২০০৬ সাল থেকে হামাসের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে আছেন তিনি।

অপরদিকে, আগেও রাজনৈতিক ব্যুরোর নেতার ভূমিকায় ছিলেম মেশাল। ২০০৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ওই পদে থাকলেও তিনি কখনো গাজায় থাকেননি। ১৯৫৬ সালে পশ্চিম তীরে জন্ম নেন তিনি।
কুয়েতে থাকা অবস্থায় হামাসে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীতে জর্ডান, সিরিয়া ও কাতারে বসবাস করেন তিনি। মার্কিন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সিইপি জানিয়েছে, তিনি হামাসের সামরিক সংগঠন থেকে রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়ার দেখভাল করেন।
বর্তমানে তিনি হামাসের প্রবাসী কার্যালয়ের প্রধান।

গত মাসে হামাসের এক সূত্র জানান, হাইয়ার প্রতি সংগঠনটির সশস্ত্র অংশ, এজেলদিন আল-কাশেম ব্রিগেডের সমর্থন আছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন হামাসের তৎকালীন নেতা ইসমাইল হানিয়া। সে সময় দলের গাজা-প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে ওই পদে নিয়োগ দেয় হামাস।
সিনওয়ারকে ৭ অক্টোবরের হামলার মূল হোতা হিসেবে বিবেচনা করে ইসরায়েল।
পরবর্তীতে গাজার দক্ষিণের শহর রাফায় সিনওয়ারকে হত্যা করে ইসরায়েল। হানিয়ার মৃত্যুর তিন মাস পর তিনি নিহত হন।
এরপর থেকে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হবেন এমন আশংকায় নতুন নেতা বাছাই করা থেকে বিরত থাকে হামাস।
কাতারভিত্তিক পাঁচ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কমিটি গঠন করে সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, যুদ্ধবিরতি চালু অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে ও সুনির্দিষ্ট আকারে নতুন হামাস নেতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাবে না ইসরায়েল।