করোনার পর দেশে অ্যালার্জির ওষুধ বিক্রি বেড়েছে

Date:

করোনা মহামারির পর বাংলাদেশে অন্য যেকোনো ওষুধের চেয়ে অ্যালার্জির ওষুধের বিক্রি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

আইকিউভিয়ার (আইকিউভিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে এসব ওষুধ বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ের চেয়ে ৭২ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালেও এই খাতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ছিল। আইকিউভিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর বিক্রি ৩০ শতাংশ বেড়েছিল।

আইকিউভিয়া এমন একটি প্রতিষ্ঠান যারা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন করা ৯৩ শতাংশ ওষুধ বিক্রির হিসাব রাখে।

এ বিষয়ে এসিআই পিএলসির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এম মহিবুজ জামান বলেন, এ ধরনের ওষুধের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশ দূষণের সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে বায়ুদূষণের কারণে অ্যালার্জি, ফুসফুস ও ত্বকের রোগের প্রকোপ বেড়েছে।

এদিকে দেশের স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বির ডা. গাজী মো. সালাহউদ্দিন মামুন বলেন, মহামারির পর থেকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ত্বকের রোগ দ্রুত বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ মনে করেন, করোনার টিকার কারণে ত্বকের রোগ বেড়েছে, কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

তিনি জানান, কয়েকটি দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা নেওয়ার পর সাময়িকভাবে ত্বকের প্রদাহজনিত কিছু সমস্যা বেড়েছিল, তবে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক হলে সেগুলো নিজে থেকেই সেরে যায়।

তবে বাংলাদেশ এখন ভিন্ন ধরনের এক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আর তা হলো রোগজীবাণুজনিত ত্বকের রোগ।

ডা. গাজী মো. সালাহউদ্দিন মামুন বলেন, মহামারির আগেই দক্ষিণ এশিয়াতে ট্রাইকোফাইটন ইন্ডোটিনিয়াই নামের ছত্রাকের কারণে সৃষ্ট টিনিয়া নামের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। তবে লকডাউনের সময় অতিরিক্ত সাবধানতা ও পরিচ্ছন্নতা নীতি মেনে চলায় সাময়িকভাবে সংক্রমণ কমেছিল। এটি এখন বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে এবং সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধে কাজ করছে না।

সামগ্রিকভাবে গত চার থেকে পাঁচ বছরে উপমহাদেশজুড়ে ত্বকের রোগ বেড়েছে বলে জানান তিনি।

হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, দেশের বাতাসে ধুলোবালির পরিমাণ বেশি থাকায় সারা দেশে অ্যালার্জির প্রবণতা বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষ অ্যালার্জির অস্বস্তি থেকে দ্রুত আরাম পেতে চায়, ফলে এসব ওষুধ ঘন ঘন ব্যবহার করছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ নিচ্ছে। আবার নিজের মতো করে ওষুধ পরিবর্তন করছে, এ কারণে এসব ওষুধের বিক্রি বাড়ছে।

মূলত দূষিত বাতাসের কারণে উদ্বেগ থেকে নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ সেবণের প্রবণতা বেড়েছে বলে জানান তিনি।

মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য ওষুধের বিক্রিও বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিক্রি ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, আর ডায়াবেটিসের ওষুধের বিক্রি বেড়েছে ৩৭ শতাংশ।

এএসিআই পিএলসির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এম মহিবুজ জামান বলেন, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ বিশ্বজুড়ে ব্যবহার হলেও বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের হার বেশি হওয়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাস ও জেনেটিক প্রভাব বেশি দায়ী।

তিনি বলেন, ‘গত ১০ থেকে ২০ বছরে প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া ও অন্যান্য হৃদরোগজনিত সমস্যার পরিমাণও বেড়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, চর্বিযুক্ত খাবারের ব্যাপারে সচেতনতা না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

তবে এসব ওষুধ গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের ওষুধকে টপকাতে পারেনি। গত বছরের প্রথম নয় মাসে এসব ওষুধের বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি।

এগুলো দেশের মোট ওষুধ বিক্রির প্রায় ১৫ শতাংশ।

বাজারে বিক্রির দিক দিয়ে গ্যাস্ট্রিকের শীর্ষ তিন ওষুধ হলোহেলথকেয়ারের সার্জেল, রেনেটা পিএলসির ম্যাক্সপ্রো এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের প্যানটোনিক্স। মোট বিক্রির মধ্যে এই তিনটি ওষুধ বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে শুধু সার্জেল বিক্রি হয়েছে ৯১৮ কোটি টাকা।

এই তিনটি ওষুধ অন্তত চার বছর ধরে বিক্রির তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। শীর্ষ দশে থাকা অন্যান্য নামগুলোর মধ্যে আছে রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালের এক্সিয়াম এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের সেকলো ও নেক্সাম। বাজারে এগুলোরও ব্যাপক চাহিদা আছে।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালের নাপা ও বাইজোরান, স্কয়ারের সেফ৩ এবং একমি ল্যাবরেটরিজের মোনাস বিক্রির তালিকায় প্রথম সারিতে আছে। এগুলোর প্রত্যেকটির বিক্রি এই সময়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি ছিল।

ল্যাবএইড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম শামীম বলেন, ‘গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের ওষুধের উচ্চ চাহিদার প্রধান কারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাস।

তিনি বলেন, ‘এখানকার মানুষ ঝাল খাবার বেশি পছন্দ করে। এ ধরনের খাবার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করে। আবার মানুষের খাবারের সময়ও অনিয়মিত, তাই দেশে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বিক্রি সবচেয়ে বেশি। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতেও আমরা এই প্রবণতা দেখি।

তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হয়েছে এবং অসুস্থ বোধ করলেই পরীক্ষা করাচ্ছে, যার ফলে কোলেস্টেরলজনিত সমস্যার শনাক্ত বেড়েছে।

এসিআই পিএলসির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এম মহিবুজ জামান বলেন, অস্বাভাবিক হারে অ্যাসিডিটির ওষুধ ব্যবহারের বড় কারণ খাদ্যে ভেজাল এবং ঝাল ও নিম্নমানের খাবার গ্রহণ।

তিনি বলেন, ‘এসব কারণে অ্যাসিডিটিসংক্রান্ত সমস্যা খুব সাধারণ হয়ে উঠেছে। ফলে রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল ও এসোমিপ্রাজলের মতো ওষুধ কয়েক দশক ধরে নিয়মিত প্রেসক্রিপশন ও ওভার-দ্য-কাউন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি জানান, ১৯৯০ দশকেই আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে এসব ওষুধের ব্যবহারের পরিমাণ দেখে অবাক হয়েছিল।

অন্যদিকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের পর অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, যার বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা, যা বছরওয়ারি হিসাবে ৭ শতাংশ বেশি।

Popular

More like this
Related

‘ঠিক কাজ’ না করলে ভেনেজুয়েলার নতুন নেতাকে ‘বড় মূল্য’ চুকাতে হবে: ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে...

হেডের অতিমানবীয় সেঞ্চুরি, ইংল্যান্ডকে দুই দিনে উড়িয়ে দিল অস্ট্রেলিয়া

সকালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস আগেভাগে থামিয়ে ৪০ রানের লিড...

আমিনবাজার ও আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশি

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা 'লকডাউন' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে...

সেন্সরে আটকে আছে বিজয়ের সিনেমা, কাটছে না জটিলতা

তামিল চলচ্চিত্রের সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের নতুন ও সম্ভাব্য শেষ...