তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কম দাম সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, এই সাময়িক সুবিধা প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতের বড় বিপদগুলোকেই আড়াল করে দিচ্ছে।
পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এলএনজি আমদানি সবসময় সাশ্রয়ী হবে এবং এশিয়ায় এর সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে—এই ধারণা আসলে খুবই ঠুনকো।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সরু জলপথ দিয়েই সম্পন্ন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দামের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।’ এতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চের প্রথম দিকে এশিয়ার এলএনজি স্পট মার্কেটের বেঞ্চমার্ক জাপান কোরিয়া মার্কারের (জেকেএম) অগ্রিম বাজারদর প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
জিইএম তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, যেহেতু কাতার থেকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পাঠানো এলএনজির বেশিরভাগই এশীয় ক্রেতাদের কাছে যায়, তাই এই অঞ্চলটি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহকৃত এলএনজির এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পার হয় এবং এর ৮০ শতাংশেরও বেশি এশীয় ক্রেতাদের কাছে যায়।
ড্রোন হামলার পর গত ২ মার্চ কাতারের বিশাল রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এলএনজি কমপ্লেক্সটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
কাতারে এলএনজি উৎপাদন ও সরবরাহ কতদিন ব্যাহত থাকবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এই সংকট এটিই স্পষ্ট করে দেয় যে এলএনজি ক্রেতাদের জন্য বাজারের অনুকূল পরিস্থিতি যেমন আগে থেকে ধারণা করা যায় না, তেমনি এর কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর এলএনজি দামের মানদণ্ড ‘জেএকেএম স্পট প্রাইস’ প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) সর্বোচ্চ ৭০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। সে সময় এলএনজি সরবরাহকারীরা বেশি দামের আশায় ইউরোপীয় বাজারের দিকে জাহাজগুলো ঘুরিয়ে দিলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার থেকে কার্যত ছিটকে পড়ে এবং এর ফলে দেশবাসীকে দফায় দফায় লোডশেডিং পোহাতে হয়।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এলএনজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। জানুয়ারিতে প্রতি ইউনিটের দাম ১১ ডলারের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু দাম এতটা কম থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় গ্যাসের চাহিদা সেভাবে বাড়েনি।
জিইএমের ‘দক্ষিণ এশিয়ার গ্যাস পরিকল্পনাগুলো অতিরঞ্জিত হতে পারে’—শীর্ষক প্রতিবেদন বা তথ্যবিবরণী অনুসারে, এই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের হাত ধরে নতুন এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার এক বিশাল জোয়ার আসতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে নির্মাণাধীন অথবা চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে এমন প্রকল্পগুলো হিসাব করলে ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা কম করে ধরলেও ৫৬ শতাংশ বাড়বে। তা সত্ত্বেও জিইএম সতর্ক করে বলেছে, এই আপাত সুযোগটি উন্নয়নশীল আমদানিকারকদের জন্য বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হতে পারে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে এলএনজির দাম কমলেও দক্ষিণ এশিয়ার ক্রেতা-বিক্রেতাদের সতর্ক থাকা উচিত, কারণ এই দৃশ্যমান সুযোগটি মরীচিকা হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই নাও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাও (আইইএ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে এলএনজির চাহিদা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়তে পারে।
দেশের বর্তমান এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বছরে ৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন, যা প্রায় দ্বিগুণ করতে নতুন করে আরও ১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন টনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। নতুন এলএনজি আমদানি টার্মিনাল নির্মাণের এই পরিকল্পনা জ্বালানি আমদানিতে দেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আটটি জনবহুল দেশের একটি। দেশটির গ্যাস অবকাঠামো সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো আগামী কয়েক দশকের জন্য তাদের সামগ্রিক জ্বালানি কাঠামোর ধরন নির্ধারণ করে দিতে পারে।’
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সহায়ক অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যর্থ হলে এলএনজি উন্নয়ন থমকে যেতে পারে, কারণ পাইপলাইন সংযোগ এখনো একটি বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে গেছে।
এলএনজি আমদানি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক গ্যাস নেটওয়ার্কের সংযোগ স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ২ হাজার ৬৯৫ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। তবে জিইএমের অনলাইন ডাটাবেস ‘এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকারে’র তথ্য অনুযায়ী, এই পাইপলাইনগুলোর মাত্র ৮ শতাংশ নির্মাণাধীন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের পুরনো গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে।
২০২৫ সালে সরকার ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতির কারণে এই অঞ্চলে বাংলাদেশ আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। ২০২৬ সালে আরও তিনটি নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
সরবরাহে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এলএনজি অন্য জ্বালানি উৎসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খেতে পারে। ‘অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে এলএনজি সস্তা হলেও এটি অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক বা লাভজনক নাও হতে পারে।’
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, এলএনজির অতিরিক্ত সরবরাহের যে সময়কালটি আশা করা হচ্ছে, তা হয়তো স্বল্পস্থায়ী হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০৩০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাজার আবারও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি যুক্তি দিয়ে বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের প্রসারের জন্য এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজার আরও দ্রুত সংকুচিত হতে পারে, যা সম্ভবত ২০৩০ সালের মধ্যেই অতিরিক্ত সরবরাহের পর্যায়টি শেষ করে দেবে।
এলএনজির দামের ওঠানামা দেশের অর্থনীতি বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে— রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি পেট্রোবাংলা এমন সতর্কতা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এলএনজির খরচ দেশে উৎপাদিত গ্যাসের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে এরইমধ্যে কিছু কারখানা তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এলএনজিতে করা বিনিয়োগের সমপরিমাণ অর্থ সৌরশক্তি এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে ব্যয় করত, তবে জ্বালানি খাতের লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্ভবত অনেক দ্রুত এবং কম খরচে অর্জন করা সম্ভব হতো।
এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ২ শতাংশেরও কম আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ফলে এই জ্বালানি ব্যবহারের হারের দিক দিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ১০ শতাংশ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংরক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রসার অস্থিতিশীল গ্যাস বাজারের ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এটি একটি নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।