ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সমীকরণ মিলছে কি?

Date:

ধরে নেওয়া যেতে পারে যে বেশ ভালো পরিকল্পনা নিয়েই ইরান যুদ্ধে নেমেছেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু, যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরও দেখা যাচ্ছে ইরান নিয়ে ওভাল অফিস কাউকেই তেমন পরিষ্কার ধারণা দিতে পারছে না। তাই বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সমীকরণ মিলছে কি?

গত ১০ মার্চ দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা নিয়ে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের হিসাবনিকাশে ভুল হচ্ছে যেভাবে।

এতে বলা হয়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প যখন ইরানে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন তখন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—তিনি মনে করেন না এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হবে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়বে।

এমনকি গত বছর জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে যখন ইরানে হামলা চালিয়েছিল তখনো তিনি বলেছিলেন, বৈশ্বিক বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। তার ভাষ্য ছিল, ‘তেলের দাম একটু বাড়লেও পড়ে তা কমে যায়।’

সে সময় ট্রাম্পের অন্যান্য উপদেষ্টারাও একই মত পোষণ করেছিলেন। তারা ইরানের তরফ থেকে কোনো আর্থিক ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা করেননি। ইরান যে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের নৌপথ বন্ধ করে দিতে পারে—এমন ধারণাও তারা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুসারে—তাদের সেই ভুল হিসাব সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেল। ইরান পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোয় বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বেড়ে গেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যাসোলিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। ট্রাম্প প্রশাসন মুক্তির পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে।

ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা নিয়ে অবমূল্যায়ন করেছেন। গত বছরের হামলায় ইরান যে ব্যবস্থা নিয়েছিল সেই তুলনায় এবারের হামলা বেশি ভয়ানক। ইরান যেন এবার অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তাই প্রতিবেশী আরব দেশগুলোয় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে চলেছে তেহরান।

আর ইসরায়েল তো ইরানের হামলার লক্ষ্য হিসেবে আছেই।

ইরানের হামলার জেরে তাড়াহুড়া করে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। আচমকা আরব উপদ্বীপের মার্কিন দূতাবাসগুলো খালি করতে হয়েছে। জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম কমানোর জন্য স্ববিরোধী নীতি প্রণয়ন করতে হচ্ছে।

গত ১০ মার্চ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির আইনপ্রণেতাদের সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এরপর ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস্টোফার এস মরফি সমাজমাধ্যমে বলেন, ‘প্রশাসন জানেই না হরমুজ প্রণালিকে আবার কীভাবে নিরাপদ করা যাবে’।

শুধু তাই নয়, ইরান যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশলের অভাব হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা হতাশ—এমনটিও জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। প্রতিবেদন অনুসারে, কর্মকর্তাদের এই হতাশার কথা রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে বলাও যাচ্ছে না। কেননা, ট্রাম্প ক্রমাগত দাবি করে চলেছেন যে তিনি ইরান যুদ্ধে পুরোপুরি বিজয়ী হয়েছেন।

আজ ১৪ মার্চ সিএনএন এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—‘হরমুজ প্রণালিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসন খাটো করে দেখেছে’। সূত্রের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো কোনো কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বাজে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

এর আগের দিন তেহরান টাইমসের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ট্রাম্প প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা: ইরানের দৃঢ়তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভুল হিসাব’। এতে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ট্রাম্প প্রশাসন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের সরকারি বার্তায় কোনো শৃঙ্খলা নেই। একেক সময় একেক বক্তব্য দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে এই সমস্যা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—যুদ্ধের লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো প্রশ্ন উঠছে।

গত ১২ মার্চ সিএনএন এর এক সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘বুম বুম’ মার্কিন অপপ্রচার বনাম ইরান যুদ্ধের নিকষ বাস্তবতা। বলা হয়, ওয়াশিংটন চায় ইসরায়েলকে নিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে মার্কিনিরা জোরালো সমর্থন দিক।

যুদ্ধের পক্ষে জনগণের সমর্থন পেতে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন ও সেন্ট্রাল কমান্ড হলিউড-স্টাইলে ভিডিও ও মিম ছড়াচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুসারে—যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারের প্রচার করা ভিডিও প্রচারণার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

গত ১০ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অপ্রত্যাশিতভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর এক জরিপে দেখা গেছে—ইরান হামলায় মার্কিনিদের সমর্থন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে পরবর্তী যেকোনো যুদ্ধের তুলনায় কম। অধিকাংশ মার্কিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছে।

গ্যালাপ জরিপ অনুসারে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে জাপানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র টোকিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর প্রায় ৯৭ শতাংশ মার্কিনি যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল।

সর্বশেষ, আফগানিস্তান যুদ্ধে ৯২ শতাংশ মার্কিনির সমর্থন ছিল।

সবচেয়ে অজনপ্রিয় ইরাক যুদ্ধেও ৭৬ শতাংশ মার্কিনি যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছিল।

গত ১ মার্চ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—রয়টার্স/ইপসস জরিপ অনুসারে প্রতি চার মার্কিনির একজন ইরান যুদ্ধে সমর্থনের কথা জানিয়েছে।

তবে গত ৩ মার্চ ট্রাম্প-সমর্থক ফক্স নিউজ জানায়—ফক্স নিউজ জরিপ: ইরান হামলা নিয়ে মার্কিনিরা দ্বিধাবিভক্ত। এই সংবাদ প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য: জরিপে অংশ নেওয়া মোট ভোটারদের মধ্যে ৫০ শতাংশ যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছে।

কিন্তু, সিএনএন-এর প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—যুদ্ধ নিয়ে অপপ্রচার নতুন কিছু নয়। তবে শত অপপ্রচার সত্ত্বেও বেশিরভাগ মার্কিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন নিজ দেশের জনগণের কাছে যুদ্ধ নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালালেও বাস্তবতা হচ্ছে, তা জনমনে প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মিত্র দেশও এই যুদ্ধের বিপক্ষে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পকে বিচলিত দেখা যাচ্ছে। একবার তিনি বলছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। আবার বলছেন, যুদ্ধ তখনই বন্ধ হবে ‘যখন এর আঁচ আমার গায়ে লাগবে’।

এদিকে, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলমান অবস্থায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক নেতাদের হত্যার পর আজ ১৪ মার্চ সিএনএন জানায়—ইরান হামলার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যেসব ঘটনা ঘটছে তা সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে।

একই দিনে বিবিসি জানিয়েছে—ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের রিপাবলিকান জোটে ফাটল ধরিয়েছে।

প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, ‘এটা ইসরায়েলের যুদ্ধ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়।’ বলা হয়—কোনো ট্রাম্পবিরোধী মানুষ এমন মন্তব্য করেননি। এমন মন্তব্য করেছেন ডানপন্থি মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাবশালী কণ্ঠ ও ফক্স নিউজের সাবেক সঞ্চালক টাকার কার্লসন। তার পরামর্শ পরিষ্কার: ‘সেখান থেকে বেরিয়ে যাও।’

প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও তা শুরু করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে জানিয়ে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী বা কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আবার অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জেতানোর স্বার্থে ইরান হামলায় যোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বকেই চরম দুর্দশায় ফেলে দিয়েছেন।

বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের ‘নিরাপদ রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচিত ধনী আরব দেশগুলো এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের দিকে আঙুল তুলছেন অনেক বন্ধু—এমন মন্তব্যও করছেন হোয়াইট হাউস-ঘনিষ্ঠ অনেক বিশ্লেষক।

তবে ট্রাম্পের শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে অনেকের অভিযোগ—মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুসারে ইরান এখনই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। এ ছাড়াও, শান্তি আলোচনার মধ্যে ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প এখন তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

 

Popular

More like this
Related

তানজিদের সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশের তিনশো ছুঁইছুঁই পুঁজি

বেশ ভালো উইকেটে শতরানের উদ্বোধনী জুটির পর  দলকে টেনে...

ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক উপদেষ্টার পদত্যাগ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড...

ইরান যুদ্ধের সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের কারণে সংবাদ মাধ্যমকে হুমকি ট্রাম্প প্রশাসনের

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে যুক্তরাষ্ট্রে...

পিরোজপুরে উদ্ধার মরদেহটি বরিশালের গোপালের, গ্রেপ্তার ২

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় উদ্ধার হওয়া মাথাবিহীন মরদেহটি বরিশালের গোপাল...