ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যখন যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে, তখন দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তাইয়্যেবেহ’ স্কুলে জমায়েত হয়েছিল শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরু করার সময়ই একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে স্কুলটিতে আঘাত হানে। এতে ভবনটি ধসে পড়লে চাপা পড়ে শিশু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্কুলে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে শিশু। আহত হয়েছে আরও অন্তত ৯৫ জন।
এই হত্যাযজ্ঞের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ইসরায়েল ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ হামলার দায় এড়ানোর চেষ্টা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্ররা টাইম ম্যাগাজিন ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, কোনো স্কুলে হামলার বিষয়ে তারা অবগত নন।
ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে দাবি করা হয়, ঘটনাস্থলটি ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) একটি ঘাঁটির অংশ ছিল।
কিন্তু, আল জাজিরার ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশনস ইউনিট ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। অনুসন্ধানে এক দশকের বেশি সময়ের স্যাটেলাইট ছবি, সাম্প্রতিক ভিডিও ফুটেজ, প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন ও ইরানের সরকারি সূত্র বিশ্লেষণ করে আল জাজিরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্কুলটি অন্তত ১০ বছর ধরে পাশের সামরিক স্থাপনা থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক ছিল।
এতে আরও দেখা যায়, হামলার ধরন এমন কিছু মৌলিক প্রশ্ন তোলে যা থেকে বোঝা যায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এমনকি হামলাটি ইচ্ছাকৃতভাবে স্কুল লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল কি না—সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের প্রথম হামলার তালিকায় মিনাবকে কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তা বোঝার জন্য শহরটিকে বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
মিনাব দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত। সরাসরি হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরের কাছে হওয়ায় প্রদেশটি সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আইআরজিসির নৌবাহিনী নেদসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও।
আইআরজিসি নৌবাহিনী ‘অসম যুদ্ধনীতি’ অনুসরণ করে। এখান থেকে দ্রুতগতির নৌযান, ড্রোন ও উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল ব্যাহত বা শত্রু নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে মিনাবের ‘সাইয়্যিদ আল-শুহাদা’ সামরিক কমপ্লেক্স বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সদর দপ্তরও রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসিফ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিগেড। এটিকে আইআরজিসি নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণাত্মক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিছু সূত্র ও ইরানের সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ স্কুলের প্রশাসনের সঙ্গে আইআরজিসি নৌবাহিনীর যোগসূত্র আছে এবং এটি বৃহত্তর স্কুল নেটওয়ার্কের অংশ। এসব স্কুলকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং মূলত আইআরজিসি সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ইরানের মেসেজিং অ্যাপ ‘বালেহর’ একটি চ্যানেলে ওই স্কুলের ভর্তি–সংক্রান্ত বার্তায় দেখা যায়, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সামরিক কর্মীদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কয়েকটি ঘোষণায় আইআরজিসি সদস্যদের সন্তানদের নির্দিষ্ট দিনে এসে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে, আর সাধারণ পরিবারের শিশুদের নিবন্ধন শুরু হয় অন্য দিনে।
তবে এই প্রশাসনিক সম্পর্ক বা শিক্ষার্থীদের পারিবারিক পরিচয় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে স্কুলটির বেসামরিক অবস্থান পরিবর্তন করে না—যতক্ষণ না এটি সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, এ ধরনের স্কুলে পড়া শিশুরা সামরিক সদস্যদের সন্তান হোক বা সাধারণ নাগরিক—সবাই সশস্ত্র সংঘাতে বিশেষভাবে সুরক্ষিত থাকার কথা। তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা বা হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ।
মানবাধিকার সংস্থা ইউরোমেড হিউম্যান রাইটস মনিটর এই হামলাকে ‘ভয়াবহ অপরাধ’ এবং বেসামরিক জনগণের জীবনের অনিরাপত্তার আরেকটি প্রমাণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটি বলেছে, আশপাশে সামরিক ঘাঁটি থাকলেই কোনো স্কুলের বেসামরিক চরিত্র বদলে যায় না। আর লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি নিশ্চিতভাবে যাচাই করার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মুক্ত নয়।
শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়। মিনাব শহর ও হরমোজগান প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়। তবে সেখানে তখনও সাধারণ জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল, শিশুরা স্কুলে যাচ্ছিল।
তখনকার ছবি ও ভিডিও যাচাই করে দেখা গেছে, স্কুলের আশপাশের সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ছিল।
সেদিনের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৩ মিনিট পর্যন্ত স্কুল ভবনটি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। ইরানি সূত্র জানায়, সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে একটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি স্কুলটিতে আঘাত হানে।
হামলার প্রকৃতি যাচাই করতে আল জাজিরার অনুসন্ধান দল টেলিগ্রামে প্রকাশিত দুটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে এবং দৃশ্যমান স্থাপনার সঙ্গে স্যাটেলাইট ছবি মিলিয়ে সেগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে।
প্রথম ভিডিওতে সামরিক ব্লকের ভেতর থেকে ধোঁয়া ওঠার দৃশ্য দেখা যায়, যা প্রমাণ করে—সামরিক ঘাঁটিটিও হামলার লক্ষ্য ছিল।
তবে দ্বিতীয় ভিডিওটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, একই সময়ে দুটি পৃথক কালো ধোঁয়ার স্তম্ভ উঠছে—একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে এবং অন্যটি ভৌগোলিকভাবে অন্য স্থানের মেয়েদের স্কুল থেকে।
এই দৃশ্য স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলে যায় এবং পাশের সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণে স্কুলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিকে ভুল প্রমাণ করে। বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে স্কুলটিকে আলাদা করে লক্ষ্যবস্তু ধরা হয়েছিল।
আল জাজিরার অনুসন্ধানী দল ২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সালে হামলার আগ পর্যন্ত সংরক্ষিত স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে। এতে দেখা যায়, গত এক দশকে নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে এই অংশটিকে সামরিক কমপ্লেক্স থেকে আলাদা করে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের ছবিতে পুরো এলাকা একটি একীভূত সামরিক কমপ্লেক্স হিসেবে দেখা যায়। তখন বাইরের সীমানা প্রাচীর ছিল অবিচ্ছিন্ন, কোণাগুলোতে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল এবং একটি মাত্র প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ওই স্কুলসহ সব ভবন সংযুক্ত ছিল।
কিন্তু ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের ছবিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন অভ্যন্তরীণ দেয়াল নির্মাণ করে স্কুলের অংশটিকে সামরিক ব্লক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়। একই সময়ে দুটি ওয়াচ টাওয়ার সরিয়ে ফেলা হয় এবং জনসাধারণের জন্য রাস্তা থেকে তিনটি নতুন প্রবেশপথ তৈরি করা হয়।
এতে ভবনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক ব্যারাকের বাইরে এনে একটি স্বতন্ত্র বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়।
২০১৮ সালের ছবিতে এর বেসামরিক ব্যবহার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে নতুন প্রবেশপথের সামনে বেসামরিক গাড়ি, ভেতরে শিশুদের খেলার মাঠ এবং দেয়ালে রঙিন দেয়ালচিত্র দেখা যায়—যা একটি বিদ্যালয়ের খুবই সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
একই এলাকায় নির্মিত আরেকটি প্রকল্প এই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি মিনাব শহর পরিদর্শন করেন আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি। তিনি সেখানে ‘শহীদ আবসালান’ নামে একটি বিশেষায়িত ক্লিনিক উদ্বোধন করেন।
প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইরানি তোমান ব্যয়ে নির্মিত এই ক্লিনিকটি একই কমপ্লেক্সের অন্য একটি অংশে তৈরি করা হয়। সেখানে সামরিক সদস্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু হয়।
স্কুলের মতোই ক্লিনিকটির জন্যও সামরিক ঘাঁটি থেকে আলাদা প্রবেশপথ ও পার্কিং এলাকা তৈরি করা হয়।
ফলে আগে যে এলাকা একটি একীভূত সামরিক কমপ্লেক্স ছিল তা তিনটি পৃথক অংশে বিভক্ত হয়ে যায়—মেয়েদের স্কুল, বেসামরিক ক্লিনিক ও সক্রিয় সামরিক ঘাঁটি।
কিন্তু ২০২৬ সালের হামলায় দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র মিনাবের সামরিক ঘাঁটি ও স্কুলে আঘাত করলেও মাঝখানে অবস্থিত ক্লিনিক অক্ষত থাকে।
অনুসন্ধানকারীরা বলছেন, এটি ইঙ্গিত দেয় যে হামলাকারীরা এমন মানচিত্র ব্যবহার করছিল যেখানে স্থাপনাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত ছিল।
এই বৈপরীত্য থেকেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে যে, যদি গোয়েন্দা তথ্য এতটাই হালনাগাদ হয় যে এক বছর আগে নির্মিত ক্লিনিককে এড়িয়ে যাওয়া যায়, তবে কীভাবে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া একটি স্কুলকে শনাক্ত করা গেল না?
এই প্রশ্ন থেকে দুটি সম্ভাবনা সামনে আসে—হয় পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করার কারণে গুরুতর ভুল হয়েছে, অথবা স্কুলটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
হামলার পর এক্স প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট দাবি করে, বাইরে থেকে কোনো হামলা হয়নি, বরং একটি ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে স্কুলে পড়েছে।
কিন্তু ওপেন সোর্স যাচাইয়ে দেখা যায়, এ দাবির সমর্থনে প্রচারিত সবচেয়ে ভাইরাল ছবিটি মিনাবের নয়। সেটি ছিল উত্তর-পশ্চিম ইরানের জানজান শহরের একটি ঘটনার ছবি, যা মিনাব থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এই দাবিকে খণ্ডন করে—মিনাব উষ্ণ উপকূলীয় শহর, যেখানে তুষারপাত হয় না। অথচ ছবিতে তুষারঢাকা পাহাড় দেখা যায়।
সবকিছু মিলিয়ে অনুসন্ধানটি শেষ পর্যন্ত দুটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে—হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী পুরোনো ও হালনাগাদ না করা তথ্যের ওপর তালিকা করেছে, যা বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি গুরুতর অবহেলার প্রমাণ। অথবা হামলাটি ইচ্ছাকৃতভাবে চালানো হয়েছে, যেন বড় ধাক্কা তৈরি করে ইরানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনসমর্থন দুর্বল করা যায়।