গত দুই বছর মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ এর অংশ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত ছিল হুতি গোষ্ঠী। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের এই বিরোধিতাকারী সশস্ত্র যোদ্ধারা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে তাদের শক্তির জানান দিয়েছিল। ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে হুতি বাহিনী বুঝিয়ে দিয়েছিল তাদের ‘হাত’ কতটা লম্বা।
অথচ, সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের প্রধান শক্তি ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ইরান যখন নিজেদের সর্বোচ্চ নেতাকে হারিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত তখন আশ্চর্যজনকভাবে আলোচনায় অনুপস্থিত হুতি গোষ্ঠী।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বোমাবর্ষণে ক্ষতবিক্ষত হুতি গোষ্ঠী সেরে ওঠার সময় নিচ্ছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে শান্তি চুক্তির আশা করছে।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা। হুতি বিদ্রোহী ও তেহরান একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যে যুদ্ধের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ব্যয় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ানো।
অর্থাৎ, হুতিরা আপাতত নিজেদের টিকিয়ে রেখে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা এড়িয়ে চলছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ আহমেদ নাগি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘হুতি বিদ্রোহী ও ইরানি বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো সময়। তারা এই যুদ্ধকে দীর্ঘ করতে চায় এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরোধ সক্ষমতা কঠিন করে তুলতে চায়। এটা তারা হিসাবনিকাশ করে নিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই এটা করা হচ্ছে।’
হুতিপ্রধান আবদুল মালিক আল-হুতি ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুত।
গত সপ্তাহে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমরা ট্রিগারে হাত দিয়ে রেখেছি।’
বিশেষজ্ঞ আহমেদ নাগি জানান, হুতিরা ইতোমধ্যে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল বরাবর, বিশেষ করে হোদেইদাহ বন্দরের আশেপাশে শক্তিবৃদ্ধি করছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত।
হুতি বিদ্রোহীদের পোস্ট করা অন্যান্য ভিডিওতে যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখা গেছে বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এসব ভিডিওতে সামরিক সংগীতের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও মার্কিন পতাকা পোড়ানোর দৃশ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘বাশা রিপোর্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল বাশা বলেন, ‘সবাই বেশ অবাক যে, হুতিরা এখনো রকেট বা ড্রোন ছুড়ছে না। কিন্তু এটি নিষ্ক্রিয়তা নয়। হুতিরা তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। নিজেদের প্রস্তুতির জানান দিচ্ছে ও বিকল্প পথ খোলা রাখছে। একইসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা এড়িয়ে চলছে।’
হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরেকটি শক্তিশালী শক্তির তৎপরতা দেখা যাবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল-হামাসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতে হুতিরা নিয়মিতভাবে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। কিছু কিছু হামলার বিস্তৃতি তেল আবিব পর্যন্ত ছিল।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম প্রকাশ্য বিবৃতিতে বন্ধু ও মিত্রদের কথা বলতে গিয়ে হুতিদের প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নির্ভীক ইয়েমেন গাজার নির্দোষ মানুষকে বাঁচানোর লড়াইয়ে থেমে থাকেনি।’
২০২২ সালে হুতি বিদ্রোহীরা দুবাই ও আবুধাবিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
২০১৫ সালে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে আরব জোট গঠন করার পর, হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অবকাঠামো ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে।
ওই হামলার বেশিরভাগ প্রতিহত করা হলেও, সেগুলো তখন নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এছাড়া লোহিত সাগরে নৌচলাচলের ক্ষেত্রে হুতিদের হুমকির বিষয়টি ইতোমধ্যে প্রমাণিত। দুই বছরে হুতি বাহিনী বেশ কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়েছে এবং বেশ কয়েকজন নাবিককে হত্যা করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল মারাত্মক ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছিল হুতি গোষ্ঠী।
এরপর লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র বোমাবর্ষণ শুরু করলেও টিকে যায় হুতি বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন সতর্ক করেছিলেন যে, হামলা বন্ধ না করলে হুতিদের ওপর ‘নরক’ নেমে আসবে। তবুও হুতি গোষ্ঠী টানা ৭ সপ্তাহ ধরে হামলা অব্যাহত রাখে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। চুক্তিতে তারা শুধু মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়।
এমনকি ট্রাম্পও হুতি গোষ্ঠীর সক্ষমতা দেখে ‘মুগ্ধ’ হয়েছিলেন এবং তাদের ‘সাহস’ ও ‘বিপুল আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা’র প্রশংসা করেছিলেন।
ক্রাইসিস গ্রুপের নাগি বলেন, ‘ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানির ট্যাংকার পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে, যেখানে এডেন উপসাগর লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে অপারেশনের দায়িত্বে থাকা মার্কিন বিশেষ বাহিনী ‘সোসেন্ট’-এর সাবেক চিফ অব স্টাফ সেথ ক্রামরিচ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘হুতিদের পুরো সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোয় হামলা করার সক্ষমতা রয়েছে।’
‘তাদের এখনো সক্রিয় হতে না দেখাটারও একটা হুমকি আছে। আমার মতে, ইরানিদের হাতে একটি শক্তিশালী প্রক্সি বাহিনী এখনো রয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।
ক্রামরিচ আরও বলেন, ‘হুতিরা ইয়েমেনজুড়ে সামরিক সরঞ্জাম ছড়িয়ে রাখছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। এটা হামলার জন্য “প্রস্তুতি”র ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে তাদের ওপর বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিও কমবে।’
তবে অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্কভাবে তাদের বিশ্লেষণ জানিয়েছে। অনেকে মনে করেন, ইয়েমেনের জনবহুল উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা মার্কিন হামলার প্রভাব থেকে ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আপাতত তারা নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ফারিয়া আল-মুসলিমি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘মার্কিন অভিযানে হুতিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মাঝারি সারির কমান্ড কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের জন্য এখনো অনেক ঝুঁকি আছে। মার্কিন হামলায় বিপর্যস্ত হলেও পরিস্থিতি যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।’
‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের’ অন্যান্য সদস্য—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের তুলনায় হুতিরা আদর্শিকভাবে ইরানের ইসলামিক শাসনের খুব একটা ঘনিষ্ঠ নয়। হুতিরা জাইদি শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য, যারা ইরানের ধর্মীয় শাসকদের শিয়া মতবাদ থেকে কিছুটা আলাদা। তবে হুতিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের মতোই শত্রুজ্ঞান করে।
বিশ্লেষকদের কেউ আবার মনে করেন, সৌদি আরবের সঙ্গে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা এবং সেটি হয়ে গেলে যে আর্থিক সুবিধা আসবে, তা হুতিদের এই যুদ্ধ থেকে দূরে রাখতে পারে।
২০২৩ সালের শেষদিকে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছায়। তবে, ৭ অক্টোবরের পর সেই প্রক্রিয়া থমকে গেলেও সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে গত ৪ বছর ধরে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে আছে।
তবে রিয়াদ হুতিদেরকে সংঘাতের বাইরে রাখতে চাওয়ার পাশাপাশি সঙ্গে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। ওমানও হুতিদের ইরান যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি সৌদিদের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক আব্দুল গনি আল-ইরিয়ানি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘সৌদিদের সঙ্গে হুতিদের চুক্তির এটাই শেষ সুযোগ। তবে মনে হয় আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিই তাদের এই যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবে।’
এরপরেও হুতিরা হয়ত মনে করে যে, ইরানের টিকে থাকার সঙ্গে তাদের টিকে থাকার সম্পর্ক খুবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্লেষক আহমেদ নাগির ভাষ্য: ‘হুতিরা জানে যে ইরানের পর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তারাই। গত দুই বছরে ইসরায়েল ইয়েমেনে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। তারা ইরান যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। বাস্তবতা এখন আর “যদি”র পর্যায়ে নেই, এখন প্রশ্ন—এটি “কবে” হবে।’