গ্রিক পুরানের কিংবদন্তি চরিত্র এরিথ্রাসের প্রাচীন সমাধির জন্য একসময় পরিচিত ছিল পারস্যের কেশম দ্বীপ। পারস্য উপসাগরের বৃহত্তম এই দ্বীপটি এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য যখন সংঘাতে জর্জরিত, এ অবস্থায় দ্বীপটি আবারও এসেছে আলোচনায়। এর কারণ দ্বীপের প্রবাল প্রাচীরের নিচে থাকা ‘ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী’।
গত তিন সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্যে মুক্ত-বাণিজ্য ও পর্যটন স্বর্গ থেকে সম্মুখসারির দুর্গে পরিণত হয়েছে এই কেশম দ্বীপ। এ অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের জন্য একটি লক্ষবস্তু হিসেবে পরিণত হয়েছে লম্বাটে আকারের ১৩০ ফুট দীর্ঘ এই দ্বীপ।
প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বীপের প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার বাসিন্দাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম এবং ‘বান্দারি’ উপভাষায় কথা বলেন। সমুদ্রকে ঘিরেই তাদের জীবন ও জীবিকা। প্রতি বছর ‘নওরোজ সায়্যাদি’ বা জেলেদের নববর্ষের সময় সমুদ্রের এই দানকে সম্মান জানাতে মাছ ধরা বন্ধ রাখেন এই দ্বীপের অধিবাসীরা।
প্রাচীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই দ্বীপের বাসিন্দারা এখন যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে বসবাস করছেন। যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর গত ৭ মার্চ মার্কিন বিমান হামলায় দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ লোনা পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অন্তত ৩০টি গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
তেহরান এই হামলাকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ‘চরম অন্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করে এবং প্রতিশোধ হিসেবে বাহরাইনের জুফাইর ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালায় ।
১৯৮৯ সাল থেকে মুক্ত-বাণিজ্য ও শিল্প অঞ্চলের মর্যাদা পায় কেশম। অথচ এই দ্বীপটিই এখন ইরানের প্রাকৃতিক ‘বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে যা কখনো ডুববে না।
বন্দর আব্বাস শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপটি ইরানের নৌ শক্তির প্রধান ঘাঁটি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
দ্বীপের গোলকধাঁধায় ঠিক কতগুলো দ্রুতগতিতে আক্রমণ উপযোগী জাহাজ ও উপকূলীয় আর্টিলারি লুকানো আছে তার সঠিক সংখ্যা গোপন থাকলেও এর কৌশলগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
লেবাননের সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান জুনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘কেশম দ্বীপে মাটির নিচে “মিসাইল সিটি”র ভেতরে ইরানের “বিধ্বংসী সক্ষমতা” মজুদ রাখা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য একটাই—হরমুজ প্রণালীকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বা বন্ধ করে দেওয়া।’
‘তারা এটি সফলভাবে করে দেখিয়েছে। ইরান গত সপ্তাহে হামলার হুমকি দেওয়ার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। তেল-গ্যাস বহনকারী হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ ট্যাংকার পার করার জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে,’ বলেন তিনি।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই জলপথ জোর করে হলেও খোলা রাখার জন্য যুদ্ধজাহাজের বহর তৈরির চেষ্টা করছে বলেও উল্লেখ করেন সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা।
আরবিতে ‘জাজিরা-আল-তাওয়িলা’ বা ‘দীর্ঘ দ্বীপ’ নামে পরিচিত কেশম গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকার তথ্য অনুযায়ী, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নৌ কমান্ডার নিয়ারকাস এই দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন ‘ওরাকটা’ যা এর মথের মতো আকৃতি নির্দেশ করে। নবম শতাব্দীর দিকে ইসলামি ভূগোলবিদরা এটাকে বলতেন ‘আবরকাওয়ান’, যার অর্থ গো-চারণক্ষেত্র।
কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ১৩০১ সালে হরমুজের শাসকরা তাতার সম্রাটের আক্রমণ থেকে বাঁচতে তাদের পুরো দরবার এখানে সরিয়ে এনেছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে এটি এ অঞ্চলের ‘পানির পিপা’ হিসেবে কাজ করত, যার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের পূর্বাঞ্চলের শুষ্ক হরমুজ রাজ্যে সুপেয় পানি সরবরাহ করা হতো। ১৫৫২ সালে অটোমান কমান্ডার পিরি রেইস এই দ্বীপে অভিযান চালিয়ে বিপুল ধনসম্পদ লুট করেন।
দ্বীপটির ঔপনিবেশিক ইতিহাসও বেশ উত্তাল। ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা এখানে একটি বিশাল পাথরের দুর্গ তৈরি করে। এক বছর পর পারস্য ও ইংরেজদের যৌথবাহিনী কেশম থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে।
১৯ শতকে ব্রিটিশরা এখানে একটি নৌঘাঁটি স্থাপন করে। এই ঘাঁটি ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান নৌবাহিনীর প্রধান কেন্দ্র ছিল। ১৯৩৫ সালে রেজা শাহ পাহলভীর অনুরোধে ব্রিটিশরা এই দ্বীপে স্থাপিত জাহাজের জ্বালানি (কয়লা) নবায়নের স্টেশন বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীতে এই দ্বীপে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এখানে রয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ভূগর্ভস্থ সাইলো।
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত কেশম দ্বীপে রয়েছে গোলকধাঁধার মতো লবণের গুহা, পান্না রঙের ম্যানগ্রোভ বনের নিচে বিচিত্র স্থাপত্য। পর্যটকরা একসময় এই ‘উন্মুক্ত ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ পরিদর্শনে যেতেন এর অনন্য শিলা বিন্যাস দেখতে।
এখানে আরও আছে ভ্যালি অব স্টার্স বা তারার উপত্যকা, যেটি হাজার বছরের ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাস্তম্ভের এক গোলকধাঁধা। স্থানীয় লোক কথা অনুযায়ী, একটি তারা খসে পৃথিবী ফেটে এই উপত্যকা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম লবণের গুহাগুলোর একটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নামাকদান গুহার অবস্থান এই দ্বীপে। এর স্ফটিকগুলো কোটি কোটি বছরের পুরোনো।
চুনাপাথর ও লবণের তৈরি গভীর ও সরু ‘চাহকুহ’ গিরিখাতের খাড়া দেয়ালগুলো পাথরের প্রাকৃতিক ক্যাথেড্রাল তৈরি করেছে।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত কেশম পারস্য উপসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ। এর প্রশস্ততা ১১ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। দ্বীপটির সর্বোচ্চ স্থান বুখুন পর্বত (৩৭০ মিটার)। এখানে প্রায় ৩৭০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৬৭টি উদ্ভিদ গোষ্ঠী রয়েছে। ইরানের অন্যতম বৃহত্তম হরা অভয়ারণ্য এই দ্বীপেই অবস্থিত। এছাড়া ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে এ দ্বীপের খারবাস গুহা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কেশম দ্বীপ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরিবেশগত বৈচিত্র্যময় স্থান। ২০০৬ সালে এই দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন ও ‘কেশম জিওপার্ক’কে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।